নারীদের সম্মান বাঁচাতে তৃণমূলকে সরাতে হবে, প্রচারে সরব পরিচারিকা কলিতা মাজি

জয় লাহা, আউশগ্রাম (বর্ধমান), ২ এপ্রিল: সংসারে অনটন নিত্যদিনের। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। সাধ থাকলেও দ্রারিদ্রতায় স্কুলের গন্ডিতেও যেতে পারেনি। পতিগৃহেও একই যন্ত্রনায় বিদ্ধ। সংসারের হাল টানতে পরিচারিকার কাজ। থেমে থাকেনি লক্ষ্য। অসহায় খেটে খাওয়া মানুষদের সুবিচার দিতে, সুদিন ফেরাতে পাঁচ বছর ধরে রাজনীতির ময়দানে নেমেছেন। শুধু রাজনীতির ময়দানে নয়, এবার একেবারে বিধানসভায় নিজের সমাজের দাবি তুলতে হেঁসেলঘর থেকে সোজা প্রার্থী। 

এতক্ষন যাঁর কথা বলছি, একেবারে দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের কলিতা মাজি। এবারে বিধানসভায় আউশগ্রাম কেন্দ্রে তাঁকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। কলিতার স্বামী সুব্রত মাজি পেশায় কল মিস্ত্রী। দুজনের রোজগারে কোনওভাবে সংসার চলে। একমাত্র ছেলে অষ্টমশ্রেণিতে পড়ে। আউশগ্রাম বিধানসভার গুসকরা পুরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের মাঝ পাড়ার বাসিন্দা কলিতা। গরিব হলেও জোটেনি সরকারি সাহায্যের বাড়ি। ভাঙ্গাবাড়ি থেকেই সোনারবাংলা গড়ার স্বপ্নে মরিয়া কলিতা। বিজেপির গুসকরা নগর মন্ডলের সম্পাদিকার দায়িত্বও সামলাচ্ছেন দক্ষতার সঙ্গে।

সকাল থেকে নিজের সংসারের কাজ ছাড়াও শহরের আরও চারটা বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন। প্রার্থী তালিকায় নাম ঘোষনা হতেই আনন্দে আত্মহারা। কারন, এতদিন মনের মধ্যে যে স্বপ্নটাকে জিইয়ে রেখেছিলেন, সেটা সাকার করার দায়িত্ব এসেছে। প্রার্থী ঘোষনা হতেই জোরকদমে প্রচার শুরু করেছেন। সকাল থেকে রাত, দিনভর বাড়ি বাড়ি জনসম্পর্ক। পায়ে হাওয়া চপ্পলই সম্বল। তাতেই চোষে বেড়াচ্ছেন মেঠো পথ বেয়ে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামগঞ্জের অলিগলি। চোখে মুখে ক্লান্তি নেই। এককবারে পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেত্রীদের মত স্বভাবসিদ্ধে কখনও হাতজোড় করে, কখন বয়স্কদের পা ছুঁয়ে প্রণাম সারছেন। আবার কখনও হুড খোলা গাড়িতে চেপে হাত নাড়াচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, আউশগ্রাম বিধানসভার সিংহভাগ জঙ্গলমহল। প্রায় ৩৭ শতাংশ অনগ্রসর শ্রেণি সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের দাবি, অসহায় পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার বাড়ি, জমির পাট্টা আর এক’শ দিনের কাজ, সরকারি ভাতা, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার পরিকাঠামো। 

গত লোকসভা নির্বাচনের আগে ওই বিধানসভা এলাকার এক গ্রামের ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের ভিডিও ভাইরাল হয়। আর তা দেখে গ্রামবাসীদের বক্তব্যের অভিযোগ শিউরে উঠেছিল গোটা দেশ। সরকারি সাহায্যে পেতে হলে মহিলাদের ‘শরীর’ দেওয়ার মত কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়। এরকম নানান অভিযোগ টনক নাড়িয়ে দেয় গোটা দেশের।

গত ২০১৬ বিধানসভায় আসনটি তৃণমূলের দখল ছিল। তৃণমূল পেয়েছিল ৯০৪৫০ ভোট, বিজেপি পেয়েছিল ১৪৬৮৬ ভোট, বামফ্রন্ট পেয়েছিল ৮৪১৯৮ ভোট। লোকসভা নির্বাচনের আগে গেরুয়া ঝড় উঠতে থাকে জঙ্গলমহলে। লেকসভায় আসন দখল করতে না পারলেও, তার নিরিখি তৃণমূলের একেবারে কাছাকাছি নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করে বিজেপি। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে আউশগ্রাম বিধানসভার ফলাফলে তৃণমূল ৯৫ হাজার ৪৮০ ভোট পেয়েছিল। বিজেপি পেয়েছিল ৮০ হাজার ৫৯২ ভোট।

গতকাল মনোনয়ন জমা দিতে এসে সাক্ষাতকারে কলিতা মাজি জানান, “এলাকার গরিব পরিবারগুলো রাজ্য সরকারের উদাসীনতায় কেন্দ্র সরকারের আয়ুষ্মান ভারতের স্বাস্থ্যবিমা থেকে বঞ্চিত। ক্ষুদ্র চাষীরা কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত। আমাদের বহু গরিব পরিবার গ্রামীণ এলাকায় ১০০ দিনের কাজও ঠিকমতো পায় না। প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনার বাড়ি চাইতে গেলে তৃণমূল নেতাদের বিছানায় ‘শরীর’ দেওয়ার প্রস্তাব আসে। এর থেকে লজ্জার কিছু হয় না। তাই মনের মধ্যে একটা জেদ ধরেছিলাম, নারীদের সম্মান বাঁচাতে তৃণমূলের অপশাসন অত্যাচার থেকে আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের পরিত্রাণ দিতে হবে। রাজ্য থেকে সরাতে হবে তৃণমূল সরকারকে।”

তিনি আরও বলেন, “নাম ঘোষনার দিনই মনিবদের বাড়িতে দেড়-দু মাসের ছুটি চেয়ে নিয়েছি। তারাও খুশী। দু হাত তুলে আমায় আশীর্বাদ করেছেন। প্রচারে এলাকার মানুষ আশীর্বাদ করছে। যেভাবে সাড়া পেয়েছি, তাতে জয় নিয়ে আশাবাদী।”

তিনি আরও বলেন, “জঙ্গলমহলে এখনও বহু গ্রামে ঢালাই রাস্তা হয়নি। বার্ধক্য ভাতা থেকে বঞ্চিত। তাই লক্ষ্য একটাই, যে দলের নেতা কর্মীরা আমাদের মতো গরিব পরিবারের সম্মান নিয়ে খেলতে চায়, তাদের পরাজিত করব। নারীদের সম্মান বাঁচাতে আমার লড়াই। সুদিন ফেরাবো। সোনার বাংলা গড়ব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *