আমাদের ভারত, বীরভূম, ১৮ অক্টোবর: গ্রামে কোনও পুজো হতো না। দুর্গাপুজো দেখতে হলে যেতে হতো তিন কিলোমিটার দূরে। কয়েকবার গ্রামে পুজো করার কথা ভাবা হলেও অর্থাভাবে পিছিয়ে গিয়েছেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু এবার কেটেছে সেই বাধা। কারণ, পুজো আয়োজনে হাত মিলিয়েছেন গ্রামের যুবকরা। তাই এবার প্রথম দুর্গাপুজো হচ্ছে বীরভূমের রামপুরহাট ১ নম্বর ব্লকের বনহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের ভেলিয়ান গ্রামে।
প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ি কিংবা বরজোল গ্রামে দুর্গাপুজো হয়। কিন্তু রাস্তার কারণে গ্রাম থেকে অশক্ত শরীরে দেবীর দর্শন করা হত না গ্রামের অনেকের। পুজোর দিনগুলোতে তাই মন খারাপেই কাটত তাদের। তবে এবার গ্রামেরই যুবকদের উদ্যোগে প্রথম বার দুর্গাপুজো শুরু হওয়ায় মুখে হাসি ফুটেছে প্রবীণদের।
রামপুরহাট শহরে যখন আলোর রোশনাই, তখন ১৫ কিলোমিটার দূরের ভেলিয়ান গ্রাম অন্ধকারাচ্ছন্ন। আশপাশের কিছু গ্রামেই দুর্গাপুজো হয়। ভেলিয়ান গ্রামে সরস্বতী পুজোর চল থাকলেও দুর্গা পুজো হতো না।
বাসিন্দারা জানান, প্রায় ৩২টি পরিবারের বাস এই গ্রামে। তাদের অধিকাংশের পেশাই কৃষিকাজ। সকলেই তফশিলি জাতি। তাই দুর্গা পুজোর খরচের কথা ভেবেই এগনো যাচ্ছিল না। কিন্তু গ্রামের বহু বৃদ্ধ- বৃদ্ধা, মহিলারা অন্য গ্রামে গিয়ে পুজো দেখতে যেতে পারতেন না। চারিদিকে ঢাকঢোল, মাইকের শব্দ, আনন্দের পরিবেশে গ্রামের মানুষের একাংশ সামিল হতে পারতেন না।
গ্রামের মানুষদের নিয়ে পুজোয় মেতে উঠতে এবার মাসখানেক থেকে উদ্যোগী হন স্থানীয় কিছু যুবক।
সভাপতি সুজিত লেট, সম্পাদক শ্রীমন্ত লেট, কলেজ লেট, সুখেন লেট, সুধাকর লেট, আকাশ লেট, বিদ্যাধর লেটরা বলেন, “দুর্গাপুজোর আয়োজন করা যে সহজ কাজ নয়, তা আমরা জানতাম। প্রতিমা, পুজোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী, অন্যান্য খরচের জন্য কম করে প্রায় এক লক্ষ টাকার কিছু বেশি প্রয়োজন। ফলে ছোট করে হলেও শুরুটা আমরা করতে চেয়েছিলাম। এরপরেই গ্রামের বাড়ি পিছু প্রত্যেকেই নিজের সামর্থ মতো দুই হাজার টাকা করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। টাকার পাশাপাশি বিভিন্ন সামগ্রী দিয়েও সাহায্য করছেন অনেকেই। প্রথমবার গ্রামেই পুজো হওয়ায় খুশি গ্রামের মহিলারা। কারণ এবার আর অন্য গ্রামে আর পুজো দেখতে যেতে হবে না, এটাই বড় ব্যাপার। এ বার পুজোর চার দিনই বাড়িতে থাকবেন বলে জানিয়েছেন গ্রামের মহিলারা। প্রথম বার গ্রামের পুজো দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আত্মীয়দেরও।
শ্রীমন্ত লেট বলেন, “এবার সরকারি অনুদান পাব আশা করিনি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই চেক আমাদের হাতে এসেছে। ওই টাকা থেকে গ্রামের কিছু মানুষ রয়েছেন যাঁরা ধার দেনা করে চাঁদা দিয়েছেন তাঁদের ফেরত দেব।”
গ্রামবাসীদের ক্ষোভ রাস্তা এবং শিক্ষা নিয়ে। রামপুরহাট – দুমকা রাস্তা ধরে কালিডাঙ্গা গ্রামের দক্ষিণে সেচ কাঁদর ধরে এগিয়ে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে ভেলিয়ান গ্রাম। ছোট্ট সেতু পেরিয়ে লাল মোড়াম এবং মাটির রাস্তা ভেঙে গ্রামে পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু এক পশলা বৃষ্টি হলে সকলকে গৃহবন্দি থাকতে হয়। পথশ্রী চতুর্থ পর্বে ওই গ্রামের ১.৪০ কিমি রাস্তা সংস্কার করার জন্য ৪৪,৭৪,৫৯১ টাকা মঞ্জুর হয়েছে। কাজ শুরুর তারিখ ধার্য হয়েছিল চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি। রাস্তার ধারে সেই কাজের বোর্ড জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু কাজ আজও শুরুই হয়নি। গ্রামে একটি অঙ্গনওয়ারি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষিকা নেই। ঘর কার্যত ভেঙে পড়েছে। ফলে প্রাথমিক পাঠ নিতে গ্রামের ছেলেমেয়েদের যেতে হয় তিন কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ি গ্রামে। তবে আশেপাশে রয়েছে জঙ্গল আর পাহাড়। এই মনোরম পরিবেশে ভেলিয়ান গ্রামের দুর্গা পুজো আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। শুধু পুজো পাঁচদিন বৃষ্টি না হওয়ার আবেদন করছেন গ্রামবাসীরা।

