মিলি আল আমিন গার্লস কলেজের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর ভাবনা জানালেন অশোক সেনগুপ্তকে।
আমাদের ভারত, ২১ ফেব্রুয়ারি: বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন পাবলিক সেক্টরে। বাবা কাজের সূত্রে বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতেন। লচ্ষীপৎ সিংহানিয়ায় কিন্ডারগার্টেনে পড়তাম। হিন্দি-ইংরেজি যতটা শিখতাম, বাংলা ততটা নয়। বাবা কিন্তু বলেছিলেন, বাংলাটা কিন্তু শিখতে হবে। নাহলে শিক্ষায় পূর্ণতা পাবে না।
মূলত মায়ের কাছেই বাংলা শেখার প্রথম পাঠ। শৈশবে মায়ের কথায় রেডিওর খবর দ্রুত লিখন করতাম। মায়ের নির্দেশ ছিল, শুদ্ধতার পাশাপাশি হাতের লেখাও যেন সুন্দর হয়। আজ ভাবি, এই বাধ্যবাধকতা ক’জন অভিভাবকের মধ্যে থাকে। দুই দিদি ছিল বয়সে একটু বড়। বন্ধু হিসাবে স্কুলে পড়বে তাই বেছে নিয়েছিলাম বই। ইংরেজি মাধ্যমের বইয়ের সঙ্গে গোগ্রাসে পড়তাম বাংলা নানা বই। পরে গোখেল, প্রেসিডেন্সিতেও বাংলা আর ইংরেজি— দুটো ডানা ছিল আমার। ফলে ভাষার ভিতটা আমার মধ্যে পোক্ত হল। পরে যখন শিক্ষকতায় আসি, সাক্ষাৎকারের সময় একজন বললেন, আপনি এত ভাল বাংলা কীভাবে শিখলেন?
আসলে এই শিক্ষার বনিয়াদ এখন আর দেখা যায় না। যে কারণে বাক্যচয়ন আর ভাবনায় দৈন্যতা, যত্রতত্র ভুল ব্যাকরণ আর বানান। খুব পীড়া দেয় এই দৃশ্য। তা সে সামাজিক মাধ্যম হোক বা ওয়েবে সিনেমা। মনে পড়ছে বইমেলার সময় বই কেনার জন্য বাবা টাকা দিতেন আমাদের। নতুন বইয়ের গন্ধ উতাল করে দিত। কেনার পর ছটফট করতাম, কখন বাড়িতে এনে পড়ব? আজ যখন দেখি বাচ্চারা ‘হযবরল’ ও ‘বুড়ো আংলা’ পড়েনি, মনে হয় আমার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মনে হয় একটা ফাঁপা প্রজন্ম (‘হলো জেনারেশন’) তৈরি করছি। এই তো, কেউ কিছু জানতে চাইলে তো গুগুলে খোঁজ করে। মেয়েকে একটা ভালো অভিধান দিতে চাই। শোভনের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম কী দেওয়া যায়।“
কিন্তু নিজের মেয়েকে তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়িয়েছেন। ওকে কি আপনার মত করতে পেরেছেন? বৈশাখির জবাব, “চেষ্টা করেছি। ওর নাম দিয়েছি ঋলিনা। এর অর্থ। আসলে আমরা ভাবনাচিন্তায় বাঙালিআনা থেকে দূরে সরে এসেছি। আয়ানের মত উর্দূ নাম দিয়ে যতটা আনন্দ পাই, চয়ণিকা নাম নিয়ে যেন ততটা আগ্রহ নেই। বাংলায় কত সুন্দর সুন্দর শব্দ আছে। সেগুলো ব্যবহারে আগ্রহ নেই আমাদের। নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিকে ‘আত্মঘাতী’ বলেছিলেন। অন্তত এসব কারণে ওই মন্তব্যটাকে সঠিক বলে মনে করি।“
আলোচনার সময় পাশ থেকে বৈশাখীকে শোভন (চট্টোপাধ্যায়) স্মরণ করিয়ে দিলেন, এই একটা ভাষা যার জন্য কত লোক প্রাণ দিয়েছেন। কীভাবে একটা রাষ্ট্রের স্বাধীনতার নেপথ্য কারণ হয়ে উঠেছিল। বৈশাখি এই প্রতিবেদককে বললেন, “কয়েক বছর আগে কলকাতা পুরসভা জানিয়েছিল দোকানের নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। বেশ আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এই তো ক’দিন আগে শোভনকে একজন ফোনে অন্য ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন। শোভন তাঁকে বললেন, ’আপনি অন্তত বাংলা নিশ্চয়ই বলতে-বুঝতে পারেন।’ ভাষার প্রতি এই সম্ভ্রমবোধটা কেন থাকবে না আমাদের?
বাংলা ভাষার এই অবস্থার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। যে জাতি মনে করে, বাংলা না শিখলে কোনও ক্ষতি নেই, তাঁদের বুঝি এটাই ভবিতব্য। ইংরেজি মানেই উৎকর্ষতা— এই বোধের শিকড়টা বুঝি প্রোথিত হয়ে গেছে। দায় এড়াতে অন্য কাউকে এখন দোষারোপ করে লাভ নেই। আগামী প্রজন্মর জন্য কোনও মাতৃভাষা রেখে যাচ্ছি আমরা? আশা ভোঁসলে ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। বিদেশে গিয়েও মারাঠি ভাষায় বলতেন। বলেছিলেন, মারাঠি আমার মাতৃভাষা। এই জোরটা ওঁকে কে দিয়েছিলেন জানেন? আরডি বর্মণ।“

