বুদবুদে স্কুল শুরু হল খোলা মাঠে, মন্দিরের আটচালায়, স্কুলের বারান্দায়, মোটরবাইকে পড়ুয়া ধরে আনলেন শিক্ষক

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৮ ফেব্রুয়ারি: টানা দুবছর বন্ধ স্কুলে পঠনপাঠন। বেড়েছে স্কুলছুটের সংখ্যা। অনেকে আবার অভাবের সংসারে রোজগারে নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুলমুখি করতে নিজের মোটরবাইকে পড়ুয়া আনলেন এক শিক্ষক। আবার খোলা মাঠ না থাকায় অবিভাবকদের সহমতে কোথাও স্কুলের বারান্দায়, কোথায় অঙ্গনওয়াড়ির বারান্দায়, কোথাও আটচালায় খুদে পড়ুয়াদের নিয়ে হল ক্লাস। সোমবার পাড়ায় শিক্ষালয়ে দুর্গাপুর, পানাগড়, বুদবুদে এমনই চিত্র ধরা পড়ল।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি- মার্চ মাস নাগাদ চিনের উহান উজাড় করা করোনার দাপট শুরু। মারণ রোগের হাত থেকে বাঁচতে শুরু হয় লকডাউন। বন্ধ হয় স্কুল কলেজ। আর এই দুবছরে অনেক শিক্ষা পেয়েছে দেশবাসী। অনলাইনে স্কুল হলেও, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পঠনপাঠন শিকেয় উঠেছিল। কার্যত গৃহবন্দি দশায় ছিল পড়ুয়ারা। করোনা প্রতিরোধে টিকাকরন শুরু হয়েছে। তবে কচিকাচ্চাদের এখনও শুরু হয়নি। এখনও কমেনি করোনার চোখ রাঙানি। তারমধ্যেই স্কুল খোলার দাবিতে ঝড় ওঠে। শুরু হয় আন্দোলন। এমনকি জল গড়িয়েছে আদালতের চৌকাঠে। জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সোমবার শুরু হয় নতুন করে স্কুল। তবে স্কুলে নয়। ক্লাস শুরু হল পাড়ায় পাড়ায়। পরিকাঠামোর ঘাটতিতে স্কুলের রুমে পঠন পাঠনেরও দাবী ওঠে। নির্দেশিকা মত সোমবার পাড়ায় পাড়ায় শিক্ষালয় শুরু হয়।

পাড়ায় শিক্ষালয় শুরু হলেও মিড-ডে-মিল রান্না ছিল স্কুলের রন্ধনশালায়। যদিও আগের দিন কলমের বদলে ঝাঁটা, বালতি হাতে নিয়ে স্কুলের সেসব পরিস্কার করে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা। তবে নির্দেশিকা থাকলেও উপায় ছিল না অনেক স্কুলে। তাই কোথায় খোলা মাঠে, কোথাও মন্দিরের আটচালায় আবার কেথাও বাধ্য হয়ে স্কুলের বারান্দায় হল ক্লাস।

বুদবুদের কালিতলায় ভিড়সিন অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস হল স্কুলের বারান্দায়। প্রশ্ন কেন হল? জানা গেছে, স্কুলের আশপাশে নেই কোনও খোলামাঠ। না আছে কোনও ক্লাবঘর কিম্বা মন্দিরের বারান্দা। প্রায় ৫০০-৭০০ মিটার দুরে ছটঘাটে খোলামাঠ। পাশেই জলাশয় থাকায় অবিভাবকদের আপত্তি।

বুদবুদ চক্রের এসআই জয়ন্ত বর্মন জানান, “স্কুলের আশপাশে সেরকম মাঠ না থাকায় অবিভাবকদের নিয়ে মিটিং ডাকা হয়। তাতে ছটঘাট এলাকার মাঠে ক্লাস করানো ঝুঁকিপুর্ন এবং আপত্তি জানায় অবিভাবকরা। তাই তাদের সহমত নিয়েই স্কুলের বারান্দায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে পঠনপাঠন হয়েছে। দীর্ঘদিন পর স্কুলে আসতে পেরে পড়ুয়ারা খুব উৎসাহি ও আনন্দিত।”

আবার বুদবুদের মুন্সেপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছবিটা ছিল অন্যরকম। দীর্ঘদিন পর স্কুল খুললেও পড়ুয়া ছিল হাতেগোনা। তাই নিজের মোটরবাইকে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ুয়া ধরে আনলেন শিক্ষক রাজীব দত্ত। তিনি বলেন, “গ্রামীণ এলাকা। ছেলেমেয়েদের নতুন করে স্কুলমুখি করতে সময় লাগবে। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্নেহ, আদর করে মোটরবাইকে চাপিয়ে স্কুলে নিয়ে এসেছি পড়ুয়াদের। মাস্ক দেওয়া হয়েছে। মিড মিল খাওয়ানো হয়েছে। ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখি করতে, পড়াশোনায় মন বসাতে সহানুভুতির সঙ্গে যা কিছু করনীয় করব।”

বাঁশকোপা প্রি-প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বুদ্ধদেব মন্ডল জানান, “গ্রামের দূর্গামন্দির ক্লাস হয়েছে। দীর্ঘদিন পর স্কুল খোলা হয়েছে। স্কুলের মিড ডে মিলের জায়গায়, রান্নার বাসনপত্র সহ সমস্ত অফিস রুম আগের দিন নিজেরাই পরিস্কার করেছি।” আবার লাউদোহার বড়গড়িয়া পড়ুয়াদের ক্লাস হল অঙ্গনওয়াড়ি সেন্টারের বারান্দায়। সেখানের প্রধান শিক্ষক শ্যামল চট্টোপাধ্যায় জানান, “কয়েকদিন পর গরম পড়বে। মাঠে ক্লাস করানোয় আপত্তি তুলেছিল অবিভাবকরা। তাই অবিভাবকদের সহমত নিয়ে অঙ্গনওয়াড়ির বারান্দায় করা হয়েছে।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *