রক্ষকই যখন ভক্ষক! তপনে দিঘির জায়গা দখলে রাতারাতি বদলালো সীমানা প্রাচীরের নকশা, প্রতিবাদে কাজ বন্ধ করে আন্দোলন স্থানীয়দের

পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ১৭ এপ্রিল: রাতারাতি সীমানা প্রাচীরের নকশা বদল তপনের দিঘিতে। প্রতিবাদে কাজ বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলন স্থানীয়দের। রবিবার এই ঘটনাকে ঘিরে তুমুল উত্তেজনা ছড়ায় তপনের দিঘি চত্বরে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তপন দিঘির রক্ষকরাই এখন ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে রাতারাতি জমির রেকর্ড বদলে দিঘির জায়গা দখল চলছে বলেও অভিযোগ। যে ঘটনা এদিন প্রকাশ্যে এনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বেশকিছু বাসিন্দারা। বন্ধ করে দেওয়া হয় দিঘির বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ। যে খবর পেয়েই এলাকায় পৌঁছায় তপন থানার বিরাট পুলিশ বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের সাথে কথা বলে সঠিকভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতিতে স্বাভাবিক হয় পরিস্থিতি।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন ব্লকের তপন হাই স্কুল ও কলেজের ঠিক পাশেই রয়েছে বহু প্রাচীন তপন দিঘি। প্রায় ৮৪ একর জমি নিয়ে রয়েছে এই দিঘিটি। যা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পরিষদের অধীনস্থ। লোক মুখে শোনা যায় প্রায় ৩ কিলোমিটার বিস্তৃত এই দিঘিতে একটা সময় প্রচুর মাছ চাষ হত। দীর্ঘ বছরেও তার সংস্কার না হওয়ায় দিঘিটি প্রায় বুঁজে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অবশেষে ২০২০ সালের প্রথম দিকে এই দিঘি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় রাজ্য সরকার। প্রথম দফায় প্রায় ৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তারপরও বেশ কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। মূলত দিঘির খননকাজ, সৌন্দর্যায়ন, মাছ রাখার হিমঘর, প্রশাসনিক ভবন, ল্যাবরেটরি, মাছ চাষের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া, এলাকার আলোর ব্যবস্থা, পর্যটনের জায়গা করে তোলা সহ বিভিন্ন কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হয় দিঘিকে কেন্দ্র করেই। রাজ্য সরকার থেকে বরাত পাওয়া ঠিকাদার সংস্থা যা দ্রুততার সাথেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে দিঘির চার পাশে প্রাচীর দেওয়ার কাজও চলছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে আগেই জানিয়েছে ঠিকাদার সংস্থা। করোনার জন্য দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকবার ফলে কাজ শেষ করার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে তপন দিঘি সংস্কারের কাজ শুরু হতেই সরকারি সেই জায়গা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে স্থানীয় কিছু তৃণমূল নেতৃত্ব। বছর খানেক আগে তপন দিঘি পাড় এলাকায় এক প্রাক্তন মন্ত্রী ও তার ১০ শাগরেদের বিরুদ্ধে জায়গা দখল করার অভিযোগ উঠেছিল। যাদের নামে রাতারাতি জমির রেকর্ডও তৈরি হয়েছিল। যা নিয়ে চরম অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার রাজনীতিতে। যে সময় তপন দিঘিকে বাঁচাতে তৈরি হয় তপন দিঘি ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটি। এদিন যাদের বিরুদ্ধেই রাতারাতি ১ একর ৯৪ শতক জায়গা দখল করবার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। আর যার জেরেই তপন দিঘির সীমানা প্রাচীরের নকশা গিয়েছে বদলে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। যে ঘটনার প্রতিবাদ জানাতেই এদিন সীমানা প্রাচীরের কাজ বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলনে নামেন বেশকিছু বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, তপন দিঘি ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির প্রায় ৬-৭ জনের নামে রাতারাতি জমির রেকর্ড তৈরি হয়েছে। টাকার বিনিময়ে রেকর্ড করে ১ একর ৯৪ শতক জমি দখল করতে চাইছে তপন দিঘি ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্যরা বলেও অভিযোগ। তাদের দাবি, ১ একর ৯৪ শতক জমির মালিক বিশ্বনাথ আচার্য নামে এক ব্যক্তি রয়েছেন। যার নামেই জমির কাগজপত্র রয়েছে। যিনি বর্তমানে কর্মসূত্রে মালদায় থাকেন। তপন দিঘির উন্নয়নে তিনি জমি দান করতেও প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। যদিও এই ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকার করে তপন দিঘি ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সম্পাদক অলোক সরকার জানিয়েছেন, বহু পুরনো এই জমি তাদের। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তোলা হয়েছে।

মোহন বর্মন, মাধব সরকার ও দাউদ হোসেনরা জানিয়েছেন, এর আগে মন্ত্রী বাচ্চু হাঁসদা ও তার দলবল দিঘির জায়গা দখল করেছে। এবারে তপন দিঘি ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্যরা জায়গা দখল করে সীমানা প্রাচীরের নকশা বদলে দিয়েছে। টাকার বিনিময়ে রাতারাতি তাদের নামে রেকর্ড তৈরি হয়েছে। যার প্রতিবাদেই এদিন তাদের আন্দোলন।

ঠিকাদার সংস্থার ম্যানেজার অতনু খাঁড়া বলেন, এর আগে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য যে জায়গা তাদের দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেভাবেই কাজ চালাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু আচমকা কয়েকজন সেই জায়গার দাবিদার বলতেই প্রাচীরের রুট বদলে যায়। যার প্রতিবাদ জানিয়েই এদিন কিছু মানুষ তাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।

অপু আচার্য নামে ওই জায়গার দাবিদারের এক আত্মীয় বলেন, তপন দিঘি ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্যরা যে জায়গার কাগজ রাতারাতি বানিয়েছেন তা তাদের বহু পুরনো জায়গা। পাশ্ববর্তী এলাকায় তাদের জায়গা থাকবার পরেও টাকার বিনিময়ে রাতারাতি তাদের জমির রেকর্ড করিয়েছেন ওই সংগঠনের সদস্যরা।

যদিও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তপন থানার আইসি ও তপন বিডিও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *