আমাদের ভারত, ২০ জুলাই: ক্ষমতায় এসেছে মাত্র আড়াই মাস। আর তার মধ্যেই তৃণমূল সংগঠন কার্যত ছিন্নভিন্ন। অথচ এই তৃণমূল কংগ্রেস শেষ তিন বড় নির্বাচনে যে অস্ত্রটি বিজেপির বিরুদ্ধে বার বার ব্যবহার করেছে, সেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্রটিকেই এবার এক্কেবারে উপড়ে ফেলতে উদ্যোগী হলো শুভেন্দু অধিকারী সরকার। অবশ্যই এর অনুপ্রেরণা অমিত শাহ। মূলত শাহর পরামর্শেই নতুন বিজেপি সরকার আরো একবার ধারালো শান দিল বাংলা ভাষা তথা বাঙালি অস্মিতার মতো অস্ত্রে। বাংলায় সরকারি কাজ করাকে বাধ্যতামূলক করা হলো। আর রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। একই সঙ্গে নিশানা দাগলেন তৃণমূল কংগ্রেসকেও।
সুকান্ত মজুমদার বলেন, শুভেন্দু অধিকারীকে প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই এই সিদ্ধান্তের জন্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরেই আজ তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ভালো এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্ত আরো একবার প্রমাণ করলো যে, “আমাদের সরকার এবং আমাদের দল ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির প্রতি কতটা দায়বদ্ধ। আমরা মনে করি যে কোনো জাতি বা যে কোনো ভাষার লোক, তাদের শিক্ষা সহ সব কাজ মাতৃভাষার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তাঁর কথায়, এর আগে প্রধানমন্ত্রী বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছেন। কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যে দায়বদ্ধ তা আমরা আবার প্রমাণ করে দিলাম। এরপরেই তিনি তৃণমূলের উদ্দেশ্যে বলেন, “যারা বলতেন বিজেপি এলে বাংলার ক্ষতি হবে, বাংলা ভাষার ক্ষতি হবে, তারা এখন কোথায় মুখ দেখাবেন সেটা যেন ঠিক করে নেন।
প্রসঙ্গত, রবিবার জাতীয় গ্রন্থাগারের শব্দ সংগ্রহ শালার উদ্বোধন করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেদিনই শুভেন্দু অধিকারীর উদ্দেশ্যে তিনি অনুরোধ করেন, বাংলা ভাষার গরিমাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে সরকারি ক্ষেত্রে তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক। ২৪ ঘন্টা কাটার আগেই সোমবার বিধানসভা অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে দেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্য সরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক। আর এই ঝোড়ো সিদ্ধান্তের ফলে তৃণমূলের তৈরি করা দীর্ঘদিনের বহিরাগত আখ্যানকে এক লহমায় ভোঁতা করে দেওয়ার সুচিন্তিত রাজনীতিও ফলপ্রসূ করা সম্ভব হলো।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের অন্যতম প্রচারের অভিমুখ ছিল বিজেপি এবং বাংলা ভাষাকে দুটি বিপরীত মেরুতে দাঁড় করানো। ভিন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের বহিরাগত বলে তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে প্রচার চালিয়ে ফায়দা তুলেছিল। পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর হামলাকেও বাঙালি বিদ্বেষ হিসেবেই দাবি করেছিল তৃণমূল, কিন্তু ২৬- এর নির্বাচনে সেই সব অস্ত্র কাজে লাগেনি।
এবার নবান্নে ক্ষমতায় এসেই এক গুজরাটি নেতার অনুরোধে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সরকারি ক্ষেত্রে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করলেন।
বিজেপি বাংলা সংস্কৃতি বিরোধী, তৃণমূলের এই চেনা অভিযোগ থেকে ৯০ ডিগ্রি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজেদের বাংলা তথা বাঙালির প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাকে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন। বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই মুক্তকন্ঠে প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে বাঙালির জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। যে কোনো বাঙালির এতে খুশি হওয়ার কথা। তবে একইসঙ্গে এর সাথে পাহাড়ে নেপালি, জঙ্গলমহলে সাঁওতালি ভাষাকেও সমপরিমাণ অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।
অনেকেই আগে বলেছেন, বিজেপির ভিত শক্ত না হওয়ার অন্যতম কারণ হিন্দি- হিন্দু- হিন্দুস্তান স্লোগান। সে দিক থেকে দেখতে গেলে পূর্ব ভারতের অধরা বাংলার ক্ষমতা দখলের আড়াই মাসের মধ্যেই ভাষার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিজেপি সর্বভারতীয় স্তরে বার্তা দিতে চাইল যে, তারা আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির বিরোধী নয়, বরং তাকে আপন করেই তারা এগিয়ে চলার পক্ষপাতী।

