আলিপুর জেল ভেঙ্গে মিউজিয়াম তৈরিতে স্থগিতাদেশ জারি করল কলকাতা হাইকোর্ট

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৮ এপ্রিল: আলিপুর সংশোধনাগার ভাঙ্গায় স্থগিতাদেশ জারি করল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের তরফে জানানো হয়েছে পরবর্তী নির্দেশ জারি না করা পর্যন্ত সংশোধনাগারে সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। হেরিটেজ এই নির্মাণ ভাঙ্গার বিরোধিতায় দায়ের মামলায় এই নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তবের ডিভিশন বেঞ্চ।

আলিপুর সংশোধনাগারের একাংশ ভেঙ্গে সেখানে ২টি সংগ্রহশালা তৈরির উদ্যোগ শুরু করে রাজ্য সরকার। মামলাকারীদের দাবি, সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য সংগ্রহশালা তৈরির কথা বলছে রাজ্য। আসলে ১০৮ একর ওই বহুমূল্য জমি প্রোমোটারদের হাতে তুলে দিতে চায় তারা।

বস্তুত, শুরু হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংগ্রহশালা তৈরির প্রস্তুতি। আলিপুরের প্রাচীরে স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবি আঁকবেন কিছু শিল্পী। আঁকবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এ কারণে তাঁর সময় চাওয়া হয়েছে।

আলিপুর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্সি জেল, আলিপুর জেলের কর্মকান্ড স্থানান্তরিত হয়েছে বারুইপুরে। ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং বিজি প্রেসের জমির ওপর হবে আধুনিক আবাসন। কিন্তু আলিপুরের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখতে হচ্ছে

অভিযোগ উঠছে, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পরিবার ও গবেষকরা এ ব্যাপারে অন্ধকারে। তাঁদের অভিযোগ, আমরা জানতে চেয়ে উত্তর পাচ্ছি না। কতটা এগিয়েছে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কাজ? কবে চালু হতে পারে? কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসকে এই প্রশ্ন করলে এই প্রতিবেদককে বলেন, “এ কারণে একটি কমিটি হয়েছে। বিষয়টি হিডকো’-র এমডি দেবাশিস সেন এবং বরিষ্ঠ শিল্পী শুভাপ্রসন্ন বলতে পারবেন।“ দেবাশিস সেনকে প্রশ্ন করলে বলেন, “ফিরহাদ হাকিম বলবেন।“

শুভাপ্রসন্নবাবুর কাছে জানতে চাইলে বলেন, “আমরা সম্প্রতি ওখানে গিয়েছিলাম। ভিতরে কাজ চলছে। ঐতিহাসিক কিছু সেল, ফাঁসির স্থান— সব মিলিয়েই ব্যাপারটা হবে। সংযোগকারী হাঁটাপথগুলো হচ্ছে। নজর রাখা হচ্ছে সৌন্দর্যায়নের ওপরেও। মোট প্রদর্শস্থল ৬৫ হাজার বর্গফুটের ওপর হবে। কবে কাজ শেষ হবে, তার আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে, আগামী ১৫ আগস্টের অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষপূর্তিতে বা তার আগে কিছু করার ইচ্ছে আছে। প্রস্তাবিত মূল ভবনের সামনে প্রায় ২০০ বর্গফুটের ওপর কিছু শিল্পী ছবি আঁকবেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আঁকবেন। এ কারণে তাঁর সময় চাওয়া হয়েছে। নানা কাজের চাপ, সামনে উপনির্বাচন—সব মিলিয়ে উনি খুব ব্যস্ত। উনি সময় দিলে আমরা প্রস্তুত।“

কিসের ছবি আঁকা হবে? শুভাপ্রসন্নবাবু বলেন, “ফ্রেসকো, বাংলায় বললে দেওয়ালচিত্র। স্বাধীনতা সংগ্রামের মোটিফ বা দ্যোতক বলতে পারেন।“

পোর্ট ব্লেয়ারে সেলুলার জেলে রয়েছে বন্দী-বিপ্লবীদের অনেক স্মৃতি। ২০২১-এ নেতাজির ১২৫ তম জন্মদিবস উপলক্ষে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি নিয়ে অশান্তি হয়। লালকেল্লাতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার উদ্যোগে হয়েছে একটি সংগ্রহশালা। সম্প্রতি কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ‘বিপ্লবী ভারত গ্যালারি’-র ভার্চুয়াল উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কেন্দ্রের এই বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজ্য চাইছে আলিপুরে একটা নজরকাড়া সংগ্রহশালা করতে।

কুমিল্লার স্টিভেন্স হত্যার জন্য আজীবন কারাদন্ডে দন্ডিত সুনীতি চৌধুরীর কন্যা ডঃ ভারতী সেন এই প্রতিবেদককে বলেন, “আলিপুর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক। স্বাধীনতার মরণপন যুদ্ধে এখানে ফাঁসিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন কত তরুণ। বন্দী থেকেছেন অনেক বিশিষ্ট মানুষ। আমার মা স্টিভেন্সকে সত্যা করার পর আলিপুর জেলে বিচারাধীন বন্দী ছিলেন। এখানকার সংগ্রহশালা যেন আর পাঁচটা সংগ্রহশালার মত না হয়। যেন উচ্চমানের ঐতিহাসিকদের ভাবনার ফসল পাওয়া যায়। জানি না, অতীতের স্মারক কতটা রাখা গিয়েছে। কানাইলাল দত্তের পরিবারের লোক ফাঁসির মঞ্চ দেখতে চেয়েছিলেন। পারেননি। দ্রষ্টব্য ছাড়াও পরিবেশনের ব্যাপারেও ভাবনাচিন্তা করতে হবে। জেলের মূল সম্মুখভাগ এবং অন্যন্য জিনিস যেন সংরক্ষণ হয়। আলো ও ধ্বণির সাহায্য নেওয়া হলে ভাল। আলিপুর জেলের ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য অপরিসীম। আগামী প্রজন্মকে বোঝাতে গেলে দায়সাড়া কাজ চলবে না।“

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি কলকাতায় নতুন পুরসভা তৈরির পর নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ”২৬ জানুয়ারি ও ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। শ্যামবাজারে জয়তু নেতাজি নামে হবে পদযাত্রা। মনীষীদের জন্মদিনে আলো দিয়ে বিশেষ ভাবে সাজানো হবে। ১৫ অগাস্ট থেকে ৭ দিন মনীষীদের স্মরণ করার ভাবনা আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সব তথ্য ডিজিটাইজ করা হবে। পলাশীর যুদ্ধ থেকে মহাবিদ্রোহ, পাঠ্যপুস্তকে রাখতে হবে। ইতিহাসকে বিকৃত করা যাবে না।”

ভারতের ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশপ্রেম নিয়ে গান লিখেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গানের লিঙ্ক শেয়ার করেন তিনি। এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ইন্দ্রনীল সেন, মনোময় ভট্টাচার্য, তৃষা পাড়ুই, দেবজ্যোতি বোস। এবার অপেক্ষায় স্বাধীনতা দিবস নিয়ে তাঁর আঁকা ছবি। কিন্তু তার আগেই এল স্থগিতাদেশ।

এই মর্মে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের মামলায় সরকারি আইনজীবীর তরফে কী ভাবে নির্মাণকাজ হবে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। তবে ফাঁকা জায়গায় কী হবে তার কোনও জবাব দিতে পারেনি সরকারপক্ষ।
এর পরই আদালত জানায়, আলিপুর সংশোধনাগারের প্রতিটি ইটে ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। তাই কোনও অবস্থাতেই হেরিটেজ এই কাঠামো ভাঙ্গার অনুমতি দেওয়া যায় না। ১৮ মে ফের মামলার শুনানি পর্যন্ত যাবতীয় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে বলে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

এই নিয়ে পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম সোমবার বলেন, আলিপুর সংশোধনাগারের বন্দিদের ইতিমধ্যে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকার কোনও হেরিটেজ কাঠামো ভাঙ্গছে না। হেরিটেজ কী করে সংরক্ষণ করতে হয় তা আমরা জানি। আমরা আদালতকে সব বুঝিয়ে বলবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *