এই পথ শেষ হলো, নিভল “সন্ধ্যা” প্রদীপ, প্রয়াত হলেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়

আমাদের ভারত, ১৫ ফেব্রুয়ারি: বাংলা গানে আধুনিকতার মূর্তপ্রতীক ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বাংলা সঙ্গীত জগতের যুগ পরিবর্তনের পথিকৃৎ শিল্পীও বলা যায়। বাংলা গানের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল তিনি। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ আক্ষরিক অর্থেই যুগাবাসন। ৯০ বছর বয়সে বাইপাসের ধারে এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। আধুনিক বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, মানবেন্দ্র চলে গেছেন। এবার নিভল সন্ধ্যা প্রদীপ। এই পথ শেষ হলো।‌

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত প্রত্যেকটি শৈলীর গান তারভাব অক্ষুন্ন রেখে নিবেদন করতেন। আমি যে জলসাঘরের, এ শুধু গানের দিন, এই পথ যদি না শেষ হয়’এর মতো সিনেমার গানের সঙ্গে সঙ্গে ‘দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি’র মতো রবীন্দ্র সংগীতও তাঁর কন্ঠে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে। তাই প্রকৃত অর্থেই তিনি গীতশ্রী। কেন্দ্র সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

১২ বছর বয়সে কলকাতার আকাশবাণীর গল্প দাদুর আসরে গান গেয়েই সম্ভবত তার পথ চলা শুরু। তখন তার পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ৫ টাকা। ১৩ বছর বয়সে প্রথম বেসিক রেকর্ড এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয়। তার বছর দুয়েকের মধ্যেই দুটি বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করার সুযোগ পান। সে দুটি ছবির নাম অঞ্জন গড় ও সমাপিকা। সেই বছরের শেষের দিকে তাঁর তিনটি আধুনিক গানের রেকর্ড বেরোয়। তখনই বোঝা গিয়েছিল তাঁর সুরের সফর দীর্ঘ হবে।

দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়াতে ১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর জন্ম। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে ছোট ছিলেন। তাঁর নিজের দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকেই জানা যায়, তার বংশের আদি পুরুষ রামগতি মুখোপাধ্যায় ছিলেন বড় সঙ্গীতজ্ঞ। রামগতি মুখোপাধ্যায়ের পুত্র সারদা প্রসাদ গান বাজনার চর্চা করতেন। এই সারদা প্রসাদের ছেলে ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ঠাকুরদা। বাবার কাছেই প্রথম গান শেখেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। মাও গান শিখিয়েছেন সন্ধ্যাকে। ভক্তিমূলক গানের শিক্ষা দিয়েই তার গানের শিক্ষা শুরু। ১৪ বছর বয়সে গীতশ্রী পরীক্ষাতে প্রথম হন।

খেয়াল ঠুমরি, ভজন, গজল, কীর্তন, ভাটিয়ালি, বাউল, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, পুরাতনী বাংলা গানের এমন কোনও ধারা নেই যেখানে ছাপ ফেলেননি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বাবার সাথেই ভারতবর্ষের নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করেছেন সন্ধ্যা। বড়ে গোলাম আলির কাছে গান শিখেছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম থাকলেও আধুনিক ছায়াছবি কিংবা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার সময় তাঁর শাস্ত্রীয় সংগীতে শিল্পীসত্ত্বা সযত্নে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা ছিল সন্ধ্যার। যেখানে যে শৈলীর গান, সেই গান সেই শৈলীতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন তিনি।

প্রায় ১৭টি হিন্দি চলচ্চিত্রেও নেপথ্য গায়িকা হিসেবে গান গেয়েছেন সন্ধ্যা। তবে বলিউডে তাঁর সঙ্গীত জীবন দীর্ঘায়িত হয়নি। ১৯৬৬ সালে কবি গীতিকার শ্যামল গুপ্তের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে জড়ান সন্ধ্যা। তাঁর বহু গানের গীতিকার শ্যামল গুপ্ত। সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মধুর সুরে সুরে একাধিক গান রেকর্ড করেছেন সন্ধ্যা।

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ে শিল্পী জীবনের অন্যতম মাইল ফলক মহিষাসুরমর্দিনীতে অংশগ্রহণ। জাতীয় পুরষ্কার সহ বহু সম্মান পেয়েছেন সন্ধ্যা। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো, মানুষের মনে থেকে যাবেন চিরকাল। তাঁর সুরেলা কণ্ঠে নস্টালজিক হয়ে যাবে বাঙালি। আজ সেই সুরের ভান্ডার বিদায় নিলেন চিরতরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *