পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর,৪ নভেম্বর: রেলস্টেশনে পুলিশের নিয়মিত অ্যান্টি- ক্রাইম তল্লাশি অভিযান চালানোর সময় উদ্ধার হলো বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ। খড়্গপুর রেলওয়ে স্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা নগদ- সহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করল খড়্গপুর জিআরপিএস (GRPS)। ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনও বৈধ নথি বা সন্তোষজনক হিসাব পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। উদ্ধার হওয়া সম্পূর্ণ অর্থ বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে খড়্গপুর রেল পুলিশ মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সকাল আনুমানিক ৯টা ১৫ মিনিট নাগাদ খড়্গপুর রেল স্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মের হাওড়া প্রান্তে অ্যান্টি- ক্রাইম ডিউটিতে নিযুক্ত ছিলেন সাব- ইনস্পেক্টর তরুণ কিশোর জেনা এবং তাঁর সঙ্গী পুলিশ কর্মীরা। সেই সময় তাঁদের নজরে আসে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে। ওই ব্যক্তির সঙ্গে ছিল দুটি হ্যান্ডব্যাগ এবং একটি নীল রঙের ব্যাকপ্যাক। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সেখান থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানা গিয়েছে।

বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কর্তব্যরত পুলিশ কর্মীরা তৎক্ষণাৎ ওই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলেন এবং তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার কথাবার্তায় অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এরপর তার সঙ্গে থাকা তিনটি ব্যাগ তল্লাশির সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতের নাম রাহুল সোনি (৩৬)। তিনি হাওড়ার ১২০, জিটি রোডের বাসিন্দা। তার পিতার নাম প্রয়াত চন্দ্রকান্ত সোনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, টাটানগর থেকে হাওড়ার উদ্দেশ্যে ওই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বহনের পক্ষে কোনও বৈধ কাগজপত্র, হিসাব বা প্রয়োজনীয় নথি তিনি পুলিশকে দেখাতে পারেননি।
ই- সাক্ষ্য বিধি মেনে ভিডিওগ্রাফি, নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি হয়। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছোন খড়্গপুর জিআরপিএসের আইসি তথা ইনস্পেক্টর অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উপস্থিতিতে আইনসম্মত পদ্ধতি মেনে তল্লাশি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। গোটা তল্লাশি অভিযানের ভিডিওগ্রাফি করা হয় ই-সাক্ষ্য (E-Sakshya) ব্যবস্থার নিয়ম অনুসরণ করে। পাশাপাশি নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আটক ব্যক্তির সঙ্গে থাকা দুটি হ্যান্ডব্যাগ ও একটি নীল রঙের ব্যাকপ্যাক খোলা হয়।
ব্যাগগুলির ভিতরে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা দেখতে পান পুলিশ কর্মীরা। এরপর ক্যাশ কাউন্টিং মেশিনের সাহায্যে উদ্ধার হওয়া অর্থের গণনা করা হয়। গণনা শেষে দেখা যায়, মোট ২৮০টি বান্ডিলে ৫০০ টাকার নোট রয়েছে। প্রতিটি বান্ডিলে নির্দিষ্ট সংখ্যক নোটের ভিত্তিতে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা।
এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ কোথা থেকে এল এবং কী উদ্দেশ্যে তা বহন করা হচ্ছিল, সেই সংক্রান্ত কোনও বৈধ নথি বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি আটক ব্যক্তি। এরপর পুলিশ সমস্ত অর্থ বাজেয়াপ্ত করে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করে।
একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা করা হয়। তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন এসআই স্বপন কুমার ভূঁইয়া। পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, আইনি বিধি মেনে এবং সুপ্রিম কোর্ট ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) নির্দেশিকা অনুসরণ করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-র ৪৭ ও ৪৮(১) ধারার বিধানও অনুসরণ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সাব-ইনস্পেক্টর টি. কে. জেনার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে খড়্গপুর জিআরপিএস থানায় ১৬৭/২৬ নম্বর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ৩১৭(২), ৩১৭(৫) এবং ৬১(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাব- ইনস্পেক্টর স্বপন কুমার ভুঁইঞাকে। উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস, এই অর্থ কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং এর পিছনে কোনও বৃহত্তর আর্থিক লেনদেনের চক্র বা অন্য কারও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী পুলিশ।
টাকার উৎস নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে। তদন্তে নতুন তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। ড়্গপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশনে দিনের আলোয় নিয়মিত অ্যান্টি- ক্রাইম ডিউটির সময় এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। টাটানগর থেকে হাওড়াগামী যাত্রাপথে ওই ব্যক্তি কেন এত বিপুল নগদ অর্থ বহন করছিলেন, অর্থের প্রকৃত মালিক কে এবং এই লেনদেনের সঙ্গে আর কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পুলিশের তদন্তে আগামী দিনে এই বিপুল নগদ অর্থের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত এবং অভিযুক্তের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে খড়্গপুর রেলস্টেশনে এই ঘটনা বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

