পুর্নবাসনের দাবিতে ভোট বয়কট করলো খনি ধসে বিপন্ন অন্ডালের হরিশপুরের বাসিন্দারা, ব্যার্থতা নিয়ে তৃণমূল- বিজেপির চাপানউতোর 

জয় লাহা, আমাদের ভারত, দুর্গাপুর, ১২ এপ্রিল: সকাল থেকে গ্রামের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে মোতায়েন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের টহল। ভোটারের অপেক্ষায় বুথে ভোট কর্মীরা। অথচ মুখ ফেরালো ভোটাররা। দফায় দফায় হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে ভোট বয়কটের বিক্ষোভ গ্রামবাসীদের। পুর্নবাসনের দাবিতে অনড় গোটা গ্রাম। পর্যবেক্ষকের অনুরোধেও গলল বরফ। এমনই নজির বিহীন চিত্র ধরা পড়ল আসানসোল লোকসভার ধস বিদ্ধস্ত অন্ডালের হরিশপুর গ্রামে। আবারও ভোট বয়কট করল হরিশপুর গ্রামের বাসিন্দারা। পুর্নবাসনের 
দায় নিয়ে চাপানউতোর তৃণমূল-বিজেপির।

প্রসঙ্গত, গত ২০২০ সালের জুলাই মাসে অন্ডালের হরিশপুর গ্রামে যাওয়ার রাস্তায় ফাটল দেখা দেয়। তারপর দফায় দফায় গ্রামে বিভিন্ন পাড়ায় ধস নামে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক’শোরও বেশি বাড়ি। ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে ঘুম ছুটে যায় গ্রামবাসীদের। প্রাণ ভয়ে অধিকাংশ বাসিন্দা গ্রাম ছাড়তে শুরু করে। প্রায় ৫০ টির মত বাড়ি ভেঙ্গে পড়ে। গ্রামে ঢোকার রাস্তা বসে পড়ে। ফাটল ধরে একাধিক বাড়িতে। ধস আতঙ্কে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা। ওই সময় পুর্নবাসনের দাবিতে ২ নং জাতীয় সড়ক ও কাজোড়া এরিয়া অফিস ঘেরাও করে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ভোট বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামবাসীরা। সোমবার ছিল আসানসোল লোকসভার উপনির্বাচন। হরিশপুর গ্রামের অঙ্নওয়াড়ি সেন্টারে ভোট গ্রহণ কেন্দ্র। সেখানে ১২৩ ও ১২৪ নং দুটি বুথ। সকাল থেকে গ্রামের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে মোতায়েন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশি টহল। ভোটারের অপেক্ষায় বুথে ভোট কর্মীরা। অথচ যাদের জন্য এত আয়োজন সেই ভোটাররা মুখ ফেরালো। বুথ মুখো হল না গ্রামবাসীরা। পাল্টা গ্রামের ভোট গ্রহণ কেন্দ্রের কিছুটা দূরে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে ভোট বয়কট করে বিক্ষোভ দেখালো।

তাতে সামিল ৮ থেকে ৮০ সকল বয়সের বাসিন্দারা। মুখে শ্লোগান ‘বিচার চাই’, ‘পুর্নরবাসন চাই’। পুর্নবাসন ছাড়া ভোট নাই। পুর্নবাসনের দাবিতে অনড় গোটা গ্রাম। দুপুর পর্যন্ত ওই ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার দেবব্রত রায় জানান, “গ্রামের কেউ ভোট দিতে আসেনি। বুথে কোনো পোলিং এজেন্টও বসেনি। কেন বসেনি, জানা নেই।” খবর পেয়ে গ্রামে যায় লোকসভা উপনির্বাচনের পর্যবেক্ষক। গ্রামবাসীদের ভোটদানে অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু পর্যবেক্ষকের অনুরোধেও গলল বরফ।”

ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের অভিযোগ, “২২ মাস আগে এক সপ্তাহে দফায় দফায় ধস হওয়ায় বেশিরভাগ গ্রামের বাসিন্দা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। কেউ আত্মীয়ের বাড়ি, কেউ ভাড়া বাড়িতে, আবার কেউ ইসিএলের পরিত্যক্ত আবাসনে। মাস কয়েক পরও প্রশাসনিক সেরকম সহযোগিতা না পাওয়ায় বহু অসহায় মানুষ জীবন জীবিকার স্বার্থে পুনরায় গ্রামে ফিরে আসে। এবং ঝুঁকি নিয়ে বসবাস শুরু করে।”

গ্রামবাসীদের আরও অভিযোগ, “আমাদের জীবন বিপন্ন। প্রশাসনিক সব জায়গায় আমাদের অসহায়তার বিষয় জানিয়েছি। গত বিধানসভা ভোটে ভোটদান থেকে বিরত থাকলেও, এখনও পর্যন্ত প্রশাসন কোনোরকম যোগাযোগ করেনি। এমনকি পানীয় জল রাস্তাঘাট উন্নয়নও থমকে রয়েছে। এক কথায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছি। তাই ভোট বয়কটের কড়া সিদ্ধান্ত। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্তে অনড়। কোনো গ্রামবাসী বুথে যাবে না।”

গ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে নয়ন গোপ জানান, “গত ২২ মাস ধরে নিরুপায় হয়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি। অথচ প্রশাসনের কোনো দেখা নেই। তাই ভোট বয়কটের চরম সিদ্ধান্ত। দাবি না মেটা পর্যন্ত গ্রামের কেউ ভোট দেবে না।” 

গ্রামের পাশে ইসিএলের মাধাবপুর খোলামুখ খনিতে জল থাকায় আপাতত কয়লা উত্তোলন বন্ধ। তবে ধস আতঙ্কে ঘুম ছুটেছে গ্রামবাসীদের। যে কোনো সময় আবারও ধসের কবলে পড়তে পারে গোটা গ্রাম। যার মধ্যে বেশি বিপদজ্জনক গ্রামের গোয়ালাপাড়া। সেখানে প্রায় ৫০ টি পরিবার এখনও ফাটল ধরা ঘরে বসবাস করছে। 

স্থানীয় বাসিন্দা তথা মদনপুর পঞ্চায়েত সদস্য তাপস গোপ জানান, “গ্রামের পরিস্থিতি অনুযায়ী গ্রামবাসীদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। আশঙ্কা যে কোনো সময় আবারও বড়সড় ধস নামতে পারে। যদি সেরকম হয়, বহু মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। আতঙ্কিত গোটা গ্রাম। তাই নিজেকে গ্রামবাসী ধরলে গ্রামের মানুষের পাশে থাকতে হবে।” 

প্রশ্ন পুর্নবাসন না হওয়ার কারণ কি? প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে সিটু নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ হারাধন রায় পুর্নবাসনের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিল। ওই মামলার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক ধস কবলিত এলাকার মানুষদের পুর্নরবাসনের জন্য ২৬৬২ কোটি টাকা অনুমোদন করে।

এডিডিএ সুত্রে জানা গেছে, ১৪১ টি এলাকা ধস কবলিত বলে চিহ্নত হয়। যার মধ্যে ৩ টি এলাকা ইসিএল নিজে পুর্নবাসনের কাজ করে। ২ টি এলাকা সার্ভে করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। বাকি ১৩৬ টি এলাকার পুর্নবাসন কাজ শুরু করে এডিডিএ। পরবর্তীকালে রাজ্য হাউসিং বিভাগকে পুর্নবাসনের কাজ দেয়। প্রতিবারই জেলা সফরে এসে প্রশাসনিক বৈঠকে পুর্নবাসনের খোঁজখবর নেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছর রানীগঞ্জের প্রশাসনিক সভা থেকে ধসকবলিত ৫ পরিবারের হাতে আবাসনের বাড়ির চাবিও তুলে দেন। কিন্তু, কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় ওইসব আবাসনে ঢুকতেই পারেনি ধসকবলিত এলাকার মানুষ। খনি অঞ্চলে ধস কবলিত এলাকার পুনরবাসন কার্যত বিশ বাঁও জলে। 

এদিকে পুর্নবাসন না হওয়ায়র দায় নিয়ে তৃণমূল- বিজেপির চাপানউতোর শুরু হয়েছে। ব্যর্থতার দায় নিয়ে একে অপরকে দুষছে।

বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তেওয়ারি জানান,”খনি অঞ্চলে দুর্গত মানুষদের পুর্নবাসন না হওয়ার কারণ রাজ্যের চরম ব্যর্থতা। কোল ইন্ডিয়া পুর্নবাসনের টাকা দিয়েছে। অথচ পুর্নবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাজ্য সরকার ও আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ। যার মাশুল দিতে হচ্ছে খনি অঞ্চলবাসীকে।”

যদিও এডিডিএ’র চেয়ারম্যান তথা রানীগঞ্জের বিধায়ক  তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় ইসিএলের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “কয়লা উত্তোলনের পর বালি ঠিকমতো ভরাট না করায় ধসের প্রবণতা। তাদের পাপ আমরা বহন করছি। পুর্নবাসন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৫৪০ কোটি টাকা দিয়েছিল। তাতে ১৫ হাজারের মত আবাসন তৈরী হয়েছে। শেষমুহূর্তের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। ধস কবলিত ১২০ টি পরিবারকে সরানো হয়েছে। গত তিনবছর ধরে ইসিএলের কাছে দ্বিতীয় দফার টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি সম্প্রসারণ করতে বলা হয়েছে। অথচ ইসিএল কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।”

বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, “গ্রামবাসীদের সমস্যার কথা জানার জন্য প্রতিনিধি পাঠিয়েছি। অনুরোধ, গ্রামবাসীরা ভোট দিক। আশ্বস্ত করছি, নির্বাচনে জিতে অবশ্যই গ্রামের সমস্যা সমাধানে পাশে থাকব।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *