আমাদের ভারত, ২২ জুন: কলকাতা পৌরসভা এলাকার স্কুলগুলির জন্য মিড ডে মিলের দায়িত্ব পাবে ইসকন। সোমবার রাজ্য বাজেটে এমনটাই ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। আর তারপর থেকেই উঠতে শুরু করেছে নানা প্রশ্ন। ইসকন কিভাবে মিড ডে মিলের দায়িত্ব নেবে? কারা পরিচালনা করবে? কী খাবার তাহলে বাঙালি পড়ুয়াদের পাতে পড়বে? তাহলে কি আর স্কুল পড়ুয়াদের দুপুরের পাতে ডিম পড়বে না? কলকাতায় কি তাহলে নিরামিষ খাবার চাপিয়ে দেওয়া হলো?
বিধানসভা অধিবেশন শেষ হওয়ার পরেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি বসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কলকাতার স্কুলগুলির জন্য মিড ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ইসকনকে। তারাই খাওয়াবে। খেয়ে দেখুন, গুণমানে ভালো। আপনার ইচ্ছে হলে হরে কৃষ্ণ বলবেন, না হলে বলবেন না। এর থেকেই স্পষ্ট হয়েছে যে কলকাতা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড ডে মিল সরবরাহ করবে ইসকন।
কিন্তু কলকাতার কিছু স্কুলে এখনও মিড ডে মিল রান্না হয়। কিছু স্কুলে কমিউনিটি কিচেন থেকে খাবার আসে। কবে থেকে এই পদ্ধতিতে বদল আসবে তা পরিষ্কার নয় দপ্তরের কাছেও। দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, নির্দেশিকা না আসা পর্যন্ত বোঝা যাবে না।
দেশের বেশ কিছু রাজ্যের পড়ুয়াদের অক্ষয় পাত্র নামের একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় ইসকন খাবার সরবরাহ করে। ওই সংস্থাটি দরিদ্র শিশুদের খাবার যোগায়। জানাগেছে, গুজরাটে মিড ডে মিলের দায়িত্বে রয়েছে ইসকন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠেছে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন গুজরাট তো নিরামিষভোজী রাজ্য। সেখানে এত প্রশ্ন উঠবে না, কিন্তু কলকাতার পড়ুয়ারা তো প্রাণীজ প্রোটিন খেতে অভ্যস্ত। তাহলে কী খাওয়ানো হবে তাদের?
স্কুল শিক্ষা দপ্তরের অধীনস্ত স্কুলগুলিতে প্রতি সপ্তাহে ডিম দেওয়া হয়। পুষ্টিগুণের বিচার করে মিড ডে মিলের খাদ্য তালিকা তৈরি করা হয়। সেখানে আমিষ খাবার রাখা জরুরি বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু ইসকনকে যদি খাবারের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে শিশুরা নিরামিষ খাবার পাবে। সেটা অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে। সরকার বিরোধী একাংশ দাবি করেছেন, সরকার এইভাবেই জোর করে খাদ্যাভ্যাস পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেকেই আবার প্রশ্ন তুলেছেন রুজির প্রশ্ন নিয়েও। অনেক স্কুলে তো রান্না হয়, রাধুনি এবং সহযোগী নিযুক্ত হয়েছেন। ইসকন দায়িত্ব নিলে তো তাদের চাকরি যাবে। ইতিমধ্যেই সরকার ঘোষণা করেছে যে রাঁধুনীদের বেতন প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে বৃদ্ধি হচ্ছে। বর্তমানে ২০০০ টাকার পরিবর্তে তারা পাবে ৩০০০ টাকা। কিন্তু আদৌ তাদের চাকরিটা থাকবে তো?
দেশের একাধিক রাজ্যে নিরামিষাশী মানুষ বেশি। ফলে সেখানে নিরামিষ খাবারই দেওয়া হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ আমিষাশী। সেখানে একেবারে রাজধানী শহর এলাকায় এই সিদ্ধান্ত কিভাবে হতে পারে বলে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষা মহলে।
আপাতত পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কলকাতার নাম ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। সম্মতি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে ধরে নেওয়া হচ্ছে অন্য জেলার স্কুল গুলিতে মিড ডে মিলে প্রাণীজ প্রোটিন পাবে পড়ুয়ারা। তাহলে কলকাতার পড়ুয়ারা কী দোষ করল? তারা কেন বঞ্চিত হবে?
সোমবারের বাজেটে মিড ডে মিল খাতে বরাদ্দ পড়ুয়া পিছু ১০ টাকা করা হয়েছে। আগে তা ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। উচ্চ প্রাথমিকে ১০ টাকা ১৭ পয়সা বরাদ্দ ছিল। সেখানে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। শিক্ষকদের একাংশ বলেছেন, বয়সের মাপকাঠি এবং চাহিদার উপর ভিত্তি করেই বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। সে ক্ষেত্রে কেন উচ্চ প্রাথমিকের বরাদ্ধ বৃদ্ধি করা হলো না? কারণ উচ্চ প্রাথমিকে পড়ুয়াদের চাহিদা বেশি, খরচও বেশি, সেখানে কেন দুটো স্তরের বরাদ্দ অর্থ প্রায় সমান রেখে দেওয়া হল?
প্রশ্ন উঠেছে একই রাজ্যে কোনো পড়ুয়া ডিম, মাংস পাবে এবং কলকাতার পড়ুয়ারা নিরামিষ খাবে, এই বৈষম্য কেন? বিজেপি তো বলেছিল মাছ- মাংস- আমিষের বিরুদ্ধে নয় তারা, তাহলে বাস্তব ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত তারা নিচ্ছে কেন?
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শিক্ষক মহাসংঘের তরফে বলা হয়েছে, ইসকনের বিষয় নিয়ে লিখিত নির্দেশ তারা এখনো পাননি, তবে তারা বলেছেন এই মিড ডে মিলের দায়িত্ব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাতে গেলেই ভালো হয়।
আবার শিক্ষক মহলের একাংশের মতে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় সংস্থাকে মিড ডে মিলের মত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত না করাই ভালো। প্রশ্ন উঠেছে কেন পড়ুয়াদের নিরামিষ খেতে বাধ্য করা হবে? বাঙালি পড়ুয়ারা তো বরাবর আমিষ খেতেই পছন্দ করে। সরকার কেন শিশুদেরও জোর করে নিরামিষ খাওয়াতে চাইছে?

