জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৭ফেব্রুয়ারি: নদীর চর দখল করে অবাধে চলছে পোস্ত চাষ। চর দখল হওয়ায় বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। এমনই নজিরবীহিন ঘটনাটি দামোদর নদের ওপর। পোস্ত চাষের খবর পেয়ে নড়ে চড়ে বসল বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন ও আবগারি দফতর। সোমবার দামোদরের চরে অবৈধ পোস্ত গাছ ভাঙ্গল আবগারি দফতর ও পুলিশ।
বাঁকুড়া ও পশ্চিম বর্ধমান দুই জেলার সীমানা দামোদর নদ। নদের উপকুলবর্তী চরে বালিমাটির উর্বরতায় চাষাবাদের অন্যতম ভুমি। আর তাতেই গড়ে উঠেছে একাধিক মানাচর। নদীর চরে চলছে আলু, পেঁয়াজ, বেগুন, মুলো, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি সহ একাধিক সব্জি চাষ। অর্থনৈতিক সাফল্যের দিশা দেখাচ্ছে মানাচরের চাষাবাদ। আর ওই চাষাবাদ দেখে নদীর চর জবর দখল বাড়ছে। গড়ে উঠছে জনবসতি। বর্ষার প্লাবনকে তোয়াক্কা না করেই চলছে বসবাস। আবার সম্প্রতি একশ্রেণির জমি মাফিয়া ওইসব জমি কব্জা করতে ময়দানে নেমেছে, বিকোচ্ছে চড়া দামে। আবার কোথাও পোস্ত চাষে ঝোঁক বাড়ছে। দামোদরের মাঝে বাঁকুড়ার বড়জোড়া ব্লকের অধীনে বেশ কয়েকটি চর তৈরী হয়েছে। গত কয়েকবছর ধরে চরের আয়তনও বেড়েছে। এবার ওইসব চর জমি মাফিয়াদের জবরদখলের কব্জায়।
শীতকালীন সব্জি চাষের পাশাপাশি নির্জন ওইসব চরে পোস্ত চাষ শুরু হয়েছে। দুর্গাপুর লাগোয়া হলেও ভৌগলিক মানচিত্র নদীর চর বাঁকুড়া জেলার আওতায়। ওইসব চরে যাওয়ার উপায় নৌকা। এছাড়া মেজিয়া ব্লকের জপমালি, জংপুর, সারামা, বিহারী মানা, শ্রীরামপুর মানা সহ বেশ কিছু নদীর চরে অবাধে চলছে পোস্ত চাষ।
পোস্তর দানা যেমন মূল্যবান। তার থেকেও পোস্তর খোলা ও তার আঠা আরও বেশী মুল্যবান, যা মাদক হিসাবে ব্যাবহৃত হয়। আর বেশী মুনাফার আশায় নদীর চরকে একমাত্র পোস্ত চাষের ক্ষেত্র তৈরী করেছে একশ্রেণির অসাধু চাষী ও মাফিয়ারা।

এছাড়াও রানীগঞ্জ, দুর্গাপুর শিল্পশহরের বুকে ২ নং জাতীয় সড়ক চলে যাওয়ায় অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্র রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের লরি, যানবাহন যাতায়াতে পাচারকারীদের পোস্তর খোল ও আফিম পাচারের সুবিধা হয়ে উঠেছে। স্বল্প সময়ে মুনাফার আশায় নদীর চরে গোপনে চলছে পোস্ত চাষ। দামোদরের দুর্গাপুর লাগোয়া চর থেকে মেজিয়া পর্যন্ত কয়েক’শ বিঘা জমিতে পোস্ত চাষ হয়েছে। ইতিমধ্যে ফুলও এসেছে ওইসব গাছে। কয়েকদিনের মধ্যে পোস্তর ফল বা ভাট তৈরী হবে। ওই ভাটে ব্লেড দিয়ে চিরে আফিম তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা মাদক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তার বাজার মুল্য কয়েক হাজার টাকা কেজি। মাদক তৈরী হওয়ায় সরকারি অনুমতি ছাড়া পোস্ত চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আবগারি দফতর সূত্রে জানা গেছে, এনডপিএস অ্যাক্ট -১৮ মোতাবেক পোস্ত চাষ বে- আইনী। ধরা পড়লে ১০-২০ বছরে জেল ও আদালতের নির্দেশ অনুসারে জরিমানা হতে পারে। যদিও এরাজ্যে অনুমোদিত পোস্ত চাষের ক্ষেত্র নেই। প্রশ্ন, তারপরও কিভাবে সরকারি জমি দখল করে চলছে পোস্ত চাষ? পোস্ত চাষের খবর পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন। মাসখানেক আগে ড্রোন দিয়ে মেজিয়া ব্লক এলাকায় দামোদর নদের চর এরিয়াল সার্ভে শুরু করে বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন এবং আবগারি দফতর। সোমবার দামোদর চরের মেজিয়া ব্লকের বানজোরা পঞ্চায়েতের জপমালি, জংপুর ও সারামা মৌজায় যৌথ অভিযান শুরু করে আবগারি দফতর ও পুলিশ প্রশাসন। প্রায় ২০০ বিঘা জমির বেআইনী পোস্ত চাষ ট্রাক্টর ও রোটার দিয়ে ভেঙ্গে দেয়।

বাঁকুড়া জেলা আবগারি দফতরের সদর রেঞ্জ ডেপুটি কালেক্টর বিশ্বজিৎ ভক্ত জানান, “দমোদরের ওই চরে পোস্ত চাষের খবর পাওয়ার পর এরিয়াল সার্ভে করা হয়েছিল। আবগারি দফতর, পুলিশ ও প্রশাসনের যৌথভাবে এদিন জংপুর মৌজার ১২০ বিঘা, জপমালি ও সারামা মৌজার ৭০ বিঘা জমির অবৈধ পোস্ত চাষ নষ্ট করা হয়েছে। প্রায় ২৫ লক্ষ পোস্ত গাছ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এধরনে অভিযান চলতে থাকবে। কয়েকদিনের মধ্যেই দামোদরের চরে সমস্ত বেআইনী পোস্ত গাছ নষ্ট করা হবে।”

