স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া,
১৭ মে: ২০১৭ সালে কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা ‘অভিশাপ’ কবিতাটিকে ঘিরে ‘হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত’ করার অভিযোগে কৃষ্ণনগর জেলা দায়রা আদালতে মামলা দায়ের হয়েছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে মামলাকারী রমিত শীলের দায়ের করা সেই মামলায় আদালতের অতিরিক্ত মুখ্য জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তরফে কবির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গত ২০ মার্চ আদালতের তরফে শ্রীজাতকে সমন পাঠানো হলেও তিনি নির্ধারিত মামলার দিন অনুপস্থিত ছিলেন। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী আদালত গত ২১ এপ্রিল কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এর পর আদালত আগামী ১১ জুন এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত করে।
এরই মধ্যে সূত্রের খবর অনুযায়ী, আজ কবি শ্রীজাত উক্ত মামলায় জামিন নেওয়ার জন্য কৃষ্ণনগর জেলা দায়রা আদালতে দরখাস্ত দাখিল করে আত্মসমর্পণ করেন। অভিযুক্ত আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছেন, এই যুক্তিতে অভিযোগকারীর তরফের আইনজীবী বিশ্বদেব টামটা আদালতে অভিযুক্তকে জামিন না দেওয়ার আবেদন জানান। তবে শুনানির পরে আদালত কবির শর্তসাপেক্ষে জামিন মঞ্জুর করে।
আদালত সূত্রের খবর, জামিনের শর্ত অনুযায়ী দুই হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ড জমা দেওয়ার নির্দেশ সহ কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতের বিনা অনুমতিতে কৃষ্ণনগর ও কলকাতার বাইরে যেতে পারবেন না।
এই প্রসঙ্গে মামলাকারী রোমিত শীল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁর যতদূর মনে পড়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করার দু’দিন পরেই শ্রীজাত এই কবিতাটি লেখেন। তাঁর অভিযোগ, এই কবিতা লেখার মূল উদ্দেশ্যই ছিল যোগী আদিত্যনাথ এবং হিন্দুদের নিয়ে তিরস্কার করা। তাঁর কথায়, তাঁর মূল অভিযোগ কবিতার শেষ দুটি লাইন নিয়ে, যেখানে লেখা ছিল,
‘যতদিন কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করবে আমায়,
কন্ডোম পরানো থাকবে তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে।’
অভিযোগকারী রোমিত শীল আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ধর্মের ত্রিশূল বলতে সনাতন ধর্মের মানুষ ভগবান শিবের হাতের অস্ত্রকেই বোঝেন, যা দিয়ে ভগবান দুষ্টের দমন ও সমাজের কল্যাণ করেন। সেই ত্রিশূলে কন্ডোম পরানোর কথা বলে প্রকারান্তরে সেটিকে পুরুষ যৌনাঙ্গের সাথে তুলনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘কবর থেকে তুলে ধর্ষণ’ প্রসঙ্গের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কবর সাধারণত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষদের দেওয়া হয়। মৃত্যু ও কবরের মাধ্যমে একটি মানুষের জীবনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সেখান থেকে তুলে ধর্ষণের কথা বলার অর্থ হলো মানুষের মানসিক বিকৃতিকে তুলে ধরা। তিনি অভিযোগ করেন, হিন্দুদের মানসিক বিকৃতির কথা বলে এবং দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত সচেতনভাবে এই লাইনগুলি লেখা হয়েছিল। একজন হিন্দু হিসেবে তাঁর নিজের এবং বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী, যাঁরা মহাদেবের আরাধনা করেন, তাঁদের সবার ধর্মীয় ভাবাবেগে এই কবিতা চরম আঘাত করেছে এবং এটি সামগ্রিকভাবে সনাতনীদের অবমাননা। এটিই তাঁর মামলার মূল ভিত্তি ও অভিযোগ বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সাহিত্য ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। সমাজের একাংশের মতে, এই বিতর্কটি আদতে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের সাথে জড়িত। অন্যদিকে, এর বিরোধী শিবিরের দাবি, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হানার মতো সংবেদনশীল ও গুরুতর অভিযোগকে যথোপযুক্ত গুরুত্ব দিয়েই আদালত আইনি পদক্ষেপ করেছে।
এমতাবস্থায়, সকলের নজর এখন আগামী দিনের আইনি লড়াইয়ের দিকেই রয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানিতে কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে ঠিক কী অবস্থান নেন এবং আদালতই বা পরবর্তীতে কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে সাহিত্য জগৎ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল।

