পুরান থেকে বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির ছবি দূর্লভপুরে বারোয়ারী মেলায়

সোমনাথ বরাট, আমাদের ভারত, বাঁকুড়া, ২৪ মার্চ:
পৌরাণিক কাহিনী চিত্রের সঙ্গে আধুনিক দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি নিয়ে শুরু দুর্লভপুর শ্মশান কালী মন্দির প্রাঙ্গণে বারোয়ারি মেলা। বারোদিনের এই মেলা চলবে আগামী ৩০ তারিখ পর্যন্ত।

পুরাণ ও আধুনিকতার এই মিশেলে এবার যোগ হয়েছে কাঁচা বাদাম স্রষ্টা ভুবন বাদ্যকর। স্হানীয় মৃৎশিল্পীরা মাটির মূর্তি বানিয়ে এক একটি পৌরাণিক দৃশ্যপট তুলে ধরেছেন। যেমন ভীষ্মের শরশয্যা, কৃষ্ণের নির্দেশমতো ভীমের জরাসন্ধ বধ, কুরুক্ষেত্রের মহারণে কর্ণের রথের চাকাকে মেদিনীর গ্রাস, রাবণ কর্তৃক সীতা হরণ ও জটায়ুর ডানা ছাঁটা, সীতার পাতাল প্রবেশ, লব কুশের অশ্বমেধের ঘোড়া আটক, লক্ষণের শক্তিশেল ইত্যাদি রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনীর পাশাপাশি আধুনিক প্রজন্মের অবক্ষয়, কর্ম সংস্থান না থাকায় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের হতাশা, বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাড়ির বাইরে বের করে দেওয়ার অমানবিকতা।

অন্যদিকে বাঁকুড়ার জঙ্গলে বুনো হাতির দাপাদাপি এবং মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া, ফসলের মাঠ মাড়িয়ে বাড়িঘর ভেঙ্গে অসহায় পরিবারগুলির নিরাশ্রয় হয়ে যাওয়ার ছবি সুন্দরভাবে নিপুন হাতের কৌশলে মৃৎশিল্পীরা বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন এই বারোয়ারি মেলায়।

তবে এবারের মেলার মূল আকর্ষণ বা থিম হল কাঁচা বাদাম। আর তা দেখতে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত জনস্রোত আছড়ে পড়ছে উত্তর বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাঁটি থানার দুর্লভপুর শ্মশান কালী মন্দির প্রাঙ্গণ সংলগ্ন দুর্লভপুর স্টেডিয়ামে। কয়েক একর জায়গাজুড়ে বিশাল মেলা বসেছে এখানে। করোনা পরিস্থিতিতে গত দু’বছর বন্ধ ছিল এই মেলা। সেই ধাক্কা কাটিয়ে এবার পূর্ণমাত্রায় হাজির। এই মেলার উদ্যোক্তা ডিভিসির মেজিয়া বিদ্যুৎ প্রকল্পের লোডিং আনলোডিং কর্মীবৃন্দ। এবার ৩২ তম বর্ষে পদার্পণ করল এই মেলা। মূলত একেবারে প্রান্তিক জনমজুর শ্রেণির মানুষজন এই মেলা পরিচালনার দায়িত্বে।

এত সুচারু ভাবে গত ৩ দশকের বেশি সময় ধরে মেলা পরিচালনা দেখে এলাকার বিশিষ্ট সমাজকর্মী কাজল খাঁ বলেন, এই এলাকায় প্রথম শিল্প স্থাপন করে ডিভিসি। সেই সময় এলাকাটির একদিকে ছিল জঙ্গল আর অন্যদিকে ধু ধু লাল কাঁকর মাটি। হাতের নাগালে বিনোদন বলতে কিছুই ছিল না। লোডিং আনলোডিং কর্মীবৃন্দ প্রথম বারোয়ারি মেলার স্বাদ এনে দিয়েছিলেন রুক্ষ পাথুরে বাঁকুড়ার উত্তর প্রান্তে।

মেলা কমিটির সম্পাদক সমীর লোহার ও সভাপতি উত্তম লোহার বলেন, চরণ লোহার, অনাথ লোহার, মন্টু লোহার দুঃখ হরণ লোহার প্রমুখরা এই মেলার প্রতিষ্ঠাতা। শুরুটা ছিল যেমন পুরানের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে। ফলে মেলার গ্ল্যামারও ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই ধারা বজায় রাখতে এবার আমরা কাঁচা বাদামের স্রষ্টা ভুবন বাদ্যকরের মূর্তি বানিয়ে মেলার থিম রেখেছি কাঁচা বাদাম। মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে হাতে সিটি গোল্ডের চেইন ধরে গান গাইছেন ভুবন বাদ্যকর। সামনে নৃত্যরত আধুনিক যুবক-যুবতীরা। আর তা দেখতেই মানুষের ঢল নেমেছে।

মেলা কমিটির পক্ষে নাটু লোহার, রঞ্জিত লোহার বলেন, প্রতিবছর দোল পূর্ণিমায় শুরু হয় এই মেলা। চলে ১২ দিন ধরে। এবারও ১৯ মার্চ মেলা শুরু হয়েছে। চলবে ৩০ মার্চ পর্যন্ত। মেলায় যারা পশরা দিয়েছেন তাদের মুখেও চওড়া হাসি। পাঁশকুড়ার চপ বিক্রেতা থেকে নগরদোলার মালিক কিংবা দক্ষিণী খাবারের দোকান থেকে স্থানীয় ফুচকাওয়ালা সকলেই একবাক্যে বলছেন করোনা ভাইরাস সমস্ত কিছু স্তব্ধ করে দিয়েছিল।এবার কিছুটা হলেও স্বস্তি পেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *