অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ১৫ মে: ১৬ মে মৌলালির স্টুডেন্টস হেলথ হোমে অপারেশন থিয়েটার চালু হচ্ছে। আপাতত হৃৎপিণ্ড ও চোখ ছাড়া সব অঙ্গেরই অস্ত্রোপচার হবে। উদ্বোধন করবেন ৭০ বছরের সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সমিতির প্রবীণতম সদস্য ও নর্থ হুগলি আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মানস দাশগুপ্ত।
গত ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সর্বসাধারণের জন্য অন্তর্বিভাগ চালু হয় হেলথ হোমে। নতুনভাবে সংস্কারের পর ১ মার্চ থেকে হোমের আউটডোরে রোগী দেখা শুরু হয়েছে। হোমের সাধারণ সম্পাদক ডা: পবিত্র গোস্বামী জানান, মুনাফাগামী চিকিৎসা পরিকাঠামোর বিপরীতে ছাত্রছাত্রীদের শাশ্বত অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখাই লক্ষ্য। সদস্য ছাত্রছাত্রীরা বরাবরের মতোই বিনামূল্যে দেখাতে পারছে। বহির্বিভাগে তাদের ওষুধ মেলে দৈনিক পাঁচ টাকার বিনিময়ে। অন্য ক্ষেত্রে সাধারণ চিকিৎসকের ৩০০ ও বিশেষজ্ঞের ভিজিট ৪০০ টাকা।

বিগত এক দশক ধরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও স্টুডেন্টস হেলথ হোম আন্দোলন এখনও স্বমহিমায়। ছাত্র মানেই ভবিষ্যত প্রজন্ম। আরও পাঁচটা সামাজিক অগ্রাধিকারের মাঝে এই ভবিষ্যত প্রজন্মের সুস্বাস্থ্যের চিন্তা অবহেলিত হবার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাতে যে সমূহ ক্ষতি। তাই ১৯৫২ থেকে ৭০ বছর পথ হেঁটেও স্টুডেন্টস হেলথ হোম আন্দোলন আজও সমান ভাবেই প্রাসঙ্গিক। জাতপাত, ধর্মীয় মাপকাঠি বা রাজনৈতিক সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় না দেবার যে বাসনা সৃষ্টি লগ্নে এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষরা মনে পোষন করেছিলেন। ইতি উতি সামান্য বিচ্যুতি ব্যতিরেকে বর্তমান কান্ডারীরাও তাকে সমান ভাবেই মর্যাদা দিয়ে চলেছেন। তাই প্রকৃত ইতিহাস না জেনে কেউ কখনও একে আক্রমন করলেও আঘাত প্রশমিত করার মানুষেরও অভাব হয় না।
বর্তমানে একদিকে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় অত্যন্ত চাপ ও অন্যান্য বিবিধ কারণে হয়রানি আর অন্যদিকে মুনাফাকামী বেসরকারি পরিষেবা সুযোগ সন্ধানীর মতো ওঁত পেতে আছে। মানুষ জেরবার। করোনা কালে এ সঙ্কট নিদারুণ ভাবে উন্মোচিত। এই সমস্যার কিছু সুরাহার সন্ধানে নেমেছে স্টুডেন্টস হেলথ হোম। পাশাপাশি নিজেকে আরও বেশি করে অর্থনৈতিক ভাবে স্বনির্ভর করাও লক্ষ্য। তাই ছাত্রদের শাশ্বত অধিকার অক্ষুন্ন রেখে সর্বসাধারণের জন্য চালু হয়েছে ন্যায্য মূল্যে হাসপাতাল কলকাতায় মৌলালীর নিজ বাড়িতে।

বিভিন্ন সময় সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বের কাজ করেছেন প্রতিষ্ঠানের তিন দশকের সঙ্গী তথা বর্তমান সম্পাদক ডা: পবিত্র গোস্বামী। তিনি জানান, “অনেকের ধারণা এটি বামপন্থীদের সমাজসেবা। কথাটা আদতেই ঠিক নয়। গোড়ার দিকে যাঁরা প্রতিষ্ঠানের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, জাতীয় কংগ্রেস নেতা, প্রাক্তন মেয়র ত্রিগুণা সেন তাঁদের অন্যতম। পড়ুয়াদের স্বাস্থ্য সতর্কতার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সদস্য করার ভাবনা মূলত তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। সেই অর্থে তিনি প্রথম সদস্য করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে।
নিয়ম অনুযায়ী পড়ুয়াদের কাছ থেকে মাথাপিছু একটা টাকা নিয়ে তা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষর হেল্থ হোমে পাঠানোর কথা। পবিত্রবাবু বলেন, “পরিমাণটি ২০০৯ পর্যন্ত ছিল মাথাপিছু বছরে ৫ টাকা। তার পর হয় ১০ টাকা। ২০১১ সালে আমাদের সদস্য ছিল প্রায় ২৩ লক্ষ। এখন কমে হয়েছে ১৫ লক্ষের মত। পঞ্চম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত স্তরের ছেলেমেয়েরা স্টুডেন্টস হেলথ হোমের সদস্য হতে পারে। ঝাড়গ্রাম, বর্ধমান জেলায় আরও শিশুরা হোমের সদস্য হতে পারে। কিন্তু বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সদস্য চাঁদা সংগ্রহ করে আমাদের কাছে পাঠাচ্ছে না। গত বছর পেয়েছি ৪৮ লক্ষ টাকা। মৌলালির সদর দফতর ছাড়াও কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ— ৩৬টা আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে আমাদের। মাসে খরচ প্রায় ৮ লক্ষ টাকা। আমরা তাই অর্থসঙ্কটে পড়েছি। এই অবস্থায় সদস্য নয় এমন যে কোনও লোককে নায্য খরচে আমাদের সদর দফতরে চিকিৎসার সুযোগ দিয়ে আয় বাড়াতে চাইছি।”

যথারীতি বিরাট অর্থ ব্যয়ে ধামাকা প্রচার নেই, তা লক্ষ্যও নয়। কারণ মুনাফাকামী স্বাস্থ্য ব্যবসার সে খরচ তো আর্ত মানুষের ঘাড় ভেঙ্গেই ওঠে। তবু রয়েছেন অসংখ্য হোম অনুরাগী, যাঁদের মুখে মুখে খবরটা চাউর হওয়ায় গত ১লা মার্চ থেকে শুরু হওয়া বহির্বিভাগ পরিষেবা গুটি গুটি পায়ে কেমন এগোচ্ছে তা পেন ক্লিনিক এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ দেবাঞ্জলী রায়ের ভাষায় ঠিক এই রকম, “আজ আমার প্রথম দিন। ১০ জন রোগী দেখলাম। তার মধ্যে ৭ জন হোম থেকে ভালো পরিষেবা মিলবে এই ভরসায় এসেছেন। শুনে খুব ভালো লাগলো”। আর আমতা নিবাসী শ্রী অলোক চন্দ্রের ভাষ্যে, “গতকাল আমার পরিবার ও সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম হোমে ডাক্তার দেখাতে। আমার অভিজ্ঞতা এককথায় অসাধারণ। ডাক্তারবাবুর রোগীর সাথে ব্যবহার ও রোগী দেখার ধরনে আমি ও আমার সহকর্মী বন্ধু অভিভূত”।
ভিজিট সাধারণ চিকিৎসক ৩০০ টাকা, বিশেষজ্ঞ ৪০০ এবং অতিবিশেষজ্ঞ ৬০০ টাকা, কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। প্রায় সমস্ত বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিয়মিত আসছেন। সদস্য ছাত্রছাত্রীরা বরাবরের মতোই বিনামূল্যে দেখাতে পারছে। বহির্বিভাগে তাদের ওষুধ মেলে দৈনিক ৫ টাকার বিনিময়ে। অতিমারী পেড়িয়ে তাদের আসার সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান।
ডাক্তারবাবুদের দেখাতে যে কোনো কাজের দিন সকাল ১০ টা থেকে সন্ধে ৬ টার মধ্যে -৯০৭৩৪৯২৮৬৬ ও ৯০০৭২৭২৮৬৬ এই নং গুলিতে ফোন করলেই হবে। ডিজিটাল এক্সরে, ইসিজি, ইইজি, পিএফটি ও প্যাথোলজির নানাবিধ পরীক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে।
হোম হাসপাতালের চার্জ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ধরা ছোঁয়ার মধ্যেই – যেমন সাধারণ বেড ভাড়া দৈনিক ৭৫০/- ও এসি বেড ভাড়া দৈনিক ১৫০০/- হোমের চিরাচরিত অপারেশন থিয়েটার নিজস্ব উৎকর্ষতা নিয়ে সামিল থাকছে। আইসিইউ, ডায়ালিসিস প্রভৃতি পরিসেবাও অচিরেই যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন হোম নেতৃত্ব।
চাকচিক্যের প্রতি আকর্ষণের বিনিময়ে নিজের অসুস্থ শরীরটাকে বাজি না রাখতে চাইলে উচ্চ বিত্ত মানুষেরও পছন্দসই হয়ে উঠতে পারে এই হাসপাতাল। কারণ এখানে কেউ তাদের পকেটের দিকে তাকিয়ে থাকার নেই। মুনাফালোভী স্বাস্থ্য পরিষেবায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর চিকিৎসায় অপ্রয়োজনীয় সিটি স্ক্যান, আঞ্জিওপ্লাস্টি, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর, এমনকি অস্ত্রোপচারের মতো ঝুঁকি পূর্ণ পদ্ধতি সামিল করার একমাত্র কারণ হয় রোগীর দেবার সামর্থ্য বা হাতে ধরা কর্পোরেট মেডিক্লেম কার্ডটি। এখানে সে সম্ভাবনা শূন্য। মেডিক্লেম ব্যবস্থাপনা যদিও থাকবে তবু হোমের যেহেতু ব্যক্তি বা কোম্পানির মালিক নেই তাই মুনাফার দায়ও নেই- যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই চিকিৎসা, ঠিক ততদিনই হাসপাতাল বাস।
এ সব কিছুর ঊর্ধ্বে সদস্য ছাত্র-ছাত্রীরা এই হাসপাতালে বরাবরের মতোই প্রায় নিখরচায় পরিষেবা পাবে। তাদের ক্ষেত্রে বেড ভাড়া দৈনিক ৩০ টাকা, ওষুধ দৈনিক ১০ টাকা। সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দিয়ে যদি কোনও উদ্বৃত্ত উপার্জিত হয় তাও ব্যবহৃত হবে সদস্য ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনেই – চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ ও তাদের এই স্বনির্ভর স্বাস্থ্য আন্দোলনের বিস্তারের লক্ষ্যে। কারণ হোমের প্রকৃত মালিক তো তারাই।

