পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের স্মৃতি (১১), “কিছু স্মৃতি ঝাপসা হলেও মোছে না”— রেবা সাহা

আমাদের ভারত, ২০ অক্টোবর: “শাসকের অত্যাচার চরমে উঠলেই অস্তিত্বের লড়াই চরম হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনের লড়াই ‘৭১ এর আন্দোলন নামে পরিচিত হলেও লড়াইটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই।” ওপার বাংলার লড়াইয়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে চলে আসা রেবা সাহা।

তাঁর কথায়, “আমার জন্ম বরিশাল, পিরোজপুরে।
১০ ভাইবোন। ১৯৬৯-‘৭০ সাল, আমার বয়স তখন ৮-৯। পাক সেনাদের বিরুদ্ধে মুক্তি বাহিনী চোরাগোপ্তা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আমার বড়দা তখন কলেজে পড়েন, তরুণ তাজা রক্ত স্বাধীনতার লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তি বাহিনীতে। বেশ বড় নেতা ছিলেন, সঙ্গে বন্দুক থাকত। কোনও ভাবে টের পেয়েছিল পাক বাহিনী।

এক রাতে আমার বাবাকে আটকে ছেলের খোঁজ জানতে চায়। বাবার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না ছেলে কোথায়! জানলেও না বলাটাই স্বাভাবিক। বাড়িতে তাণ্ডব শুরু হয়। মনে পরে, ভয়ে আমরা কাঁদতে শুরু করলে মা মুখ চেপে ধরে যাতে কান্নার শব্দ শোনা না যায়! শুনলে মেয়েদের উপর অত্যাচার শুরু হবে। বাবাকে মারতে মারতে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মুখে কাপড় গুঁজে, হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখে এক মুসলিম পরিবারের কাঁচা বাথরুমে (তখনকার খাটা পায়খানা)। সেখানে বাবা পরে থাকেন ৯ দিন।

মা আমাদের ভাই-বোনদের নিয়ে বাড়ির পিছন দিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন এক মুসলিম প্রতিবেশীর বাড়িতে। কারণ মুসলিম বাড়িতে আক্রমণের আশঙ্কা অনেক কম। মুসলিম, কিন্তু আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, আমার মা সহ গোটা পরিবারের সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলেন।

পাক বাহিনী যাওয়ার আগে ‘৬৮-‘৬৯ এর কোনও এক রাতে আমাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়। আমার বাবা ছিলেন জর্জ কোর্টের মুহুরি, সে সময়ে আমাদের কাঠের ৩ তলা বাড়ি, গোলা ভরা ধান। মনে আছে প্রায় ৩ মাস ধরে ধিকি ধিকি পুড়েছিল আমাদের বিরাট বাড়িটা। ৯ দিন পর বাবাকে আধমরা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় জঙ্গল থেকে। কাঁচা বাথরুমে নোংরায় থেকে গায়ে পোকা হয়ে গিয়েছিল। ঘরের জিনিসপত্র সব পুড়ে খাক। মাটির হাঁড়িতে কচুশাক সিদ্ধ খেতে হয়েছে আমাদের। কাদের জন্য? বুঝতে পারি না আজও, এত বছর পরেও।

যে কোনও রাষ্ট্রীয় আন্দোলন দমন করার জন্য অন্যতম হাতিয়ার ছিল মেয়েরা। পাক সেনারা যে কত মেয়েদের ইজ্জত নিয়েছে সে সংখ্যা তুলে রাখতে পারেনি পরিসংখ্যান। পাক সেনাদের প্রথম পছন্দ ছিল হিন্দু মেয়ে, অবিবাহিত হলে তো কথাই নেই। মনে আছে আমার এক পিসতুতো দিদিকে বাড়িতে রাখা হতো শাঁখা-সিঁদুর পরিয়ে, অথচ দিদির তখন বিয়েই হয়নি।

আগেই বলেছি বাবা কোর্টের মুহুরি ছিলেন, আমরা বেশ বিত্তবান ছিলাম। টাকার জন্য আমাদের বাড়িতে হামলা হয়। আঁচ পেয়ে বাবা আগেই পালিয়ে এসেছিলেন ভারতে। বাবাকে না পেয়ে আমারই কাকা ও আরও ২ জনকে (তাঁরা কারা এখন পরিচয় মনে নেই) পাকরাও করে পাকপন্থীরা। বিপুল টাকার দাবি জানায়। কাকা দিতে পারায় এক লাইনে কাকা ও আরও ২ জনকে দাঁড় করিয়ে গুলি করে পালায়। ২ জনই মারা যায়। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান কাকা। কিন্তু বাঁ হাতটা সারা জীবনের জন্য অকেজো হয়ে যায়।

এর পর বাংলাদেশে গিয়েছি। বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পরে, দেশ স্বাধীনের পরে দাদু আবার বাড়ি করেন। কিছু স্মৃতি ঝাপসা হলেও মোছে না, মেয়েবেলার-কিশোরীবেলা এমন বহু স্মৃতি আজও একলা মনে তাড়া করে বেড়ায়।

কেন আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের সুন্দর প্রকৃতি-বাড়ি-পরিবেশ উপহার দিতে পারলাম
না? কেন বা আমাদের সব ছেড়ে ছিন্নমূল হতে হল? কেন পরভূমকে নিজভূম বানাতে হল?

অনুলিখনঃ সুস্মিতা সাহা।
সঙ্কলন— অশোক সেনগুপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *