পরিযায়ী শ্রমিক থেকে হয়েছিলেন কোভিড যোদ্ধা, আজ এই যুবকদের দুকূল হারিয়ে সঙ্গী শুধুই হতাশা

আশিস মণ্ডল, সিউড়ি, ১০ সেপ্টেম্বর: ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক। লকডাউনে কাজ হারিয়ে করোনা নিয়ে কোনো মতে বাড়ি ফিরে হয়েছিলেন ‘কোভিড যোদ্ধা’। মাসের পর মাস দিনরাত এক করে নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন করোনা আক্রান্তদের সেবায়। সামান্য রোজগারের তাগিদে। সেই কাজও এবার হয়েছে হাতছাড়া। একূল ওকূল দুই হারিয়ে আজ দিশাহারা পরিযায়ী শ্রমিক থেকে কোভিড যোদ্ধা হওয়া সেই সকল যুবকরা। তাই কাজের জন্য দলবেঁধে বীরভূম জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা।

বীরভূমের নলহাটির মিলন শেখ। সেলাইয়ের কাজ করতেন মুম্বাইয়ে। প্রথমে লকডাউনে কাজ খুইয়ে সর্বস্ব উজার করে ফিরেছিলেন বাড়ি। শরীরে ছিল করোনার থাবা। গাঁয়ে থাকতে পারেননি। শেষমেশ নাম লিখিয়েছিলেন করোনা যোদ্ধা হিসাবে। প্রশাসনের ডাকে ছুটেছিলেন রামপুরহাটের কোভিড হাসপাতালে। দিনরাত এক করে কোভিড রোগীদের সেবা করাই ছিল তাঁর উপর দেওয়া দায়িত্ব। কি অভিজ্ঞতা এই মিলন শেখের? আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, “শরীরে করোনা ছিল। বাড়িতে থাকতে পারিনি। তারপর সিএমওএইচ দপ্তর থেকে ডাক পেলাম। কাজ জুটল কোভিড হাসপাতালে।  কাজ শুরু করলাম। সেকথা গাঁয়ে জানার পর আর বাড়ি ঢোকার সুযোগ ছিল না। প্রধান, পঞ্চায়েত সদস্যরা পর্যন্ত বাড়ি গিয়ে বলে এসেছিল, ছেলে করোনা রোগীদের সাথে আছে। গ্রামে যেন না আসে। টানা পাঁচমাস বাড়ি যাইনি। হাসপাতালেই কাটিয়েছি। মাসে পনেরো হাজার টাকার বিনিময়ে। ওই টাকাটাই এখন সব। কারণ বাইরের কাজ তো আর নেই।” মিলনের মত এমন বহু পরিযায়ী শ্রমিক গোটা রাজ্যে নানা প্রান্তে ‘কোভিড যোদ্ধা’র তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু বাধ সেধেছে আগস্ট মাসের ৩১ তারিখের পর। কারণ তাদের কাজের মেয়াদ আর বাড়ায়নি সরকার বা প্রশাসন। ‘ছুটি’ দিয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, কোভিড যোদ্ধা হয়ে ওঠা পরিযায়ী শ্রমিকরা এখন বেকার। তাই শুক্রবার বীরভূমের কাজ হারানো এমন কোভিড যোদ্ধারা এসেছিলেন জেলা শাসকের দপ্তরে। কাজ চেয়েছেন, রোজগারের ব্যবস্থার আর্জি জানিয়েছেন।

যেমন ভেলিয়ানের রেজাজুল শেখ রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন মুম্বাইয়ে। তিনিও লকডাউনে একই দুর্ভোগের শিকার হয়ে করোনা নিয়েই ফিরেছিলেন জেলায়। নাম লিখিয়েছিলেন করোনা যোদ্ধা হিসাবে। তাকে পাঠানো হয়েছিল সুদূর কলকাতার বাঙ্গুর হাসপাতালে। সেখানেই মাসের পর মাস তিনি পড়েছিলেন করোনা রোগীদের সেবা করে দুটো রোজগারের তাগিদে। আজ কাজ হারিয়ে ভেবে কূল পাচ্ছেন না কি করবেন। এদের মতই আরও একজন সাহেব ঘোষ। রাজগ্রামের এই যুবকের কথায়, “ভিন রাজ্যে থাকতে করোনা নিয়ে ফিরেছিলাম। কাজ গেছে তখনই। ফিরে ডিউটি নিয়েছিলাম করোনা হাসপাতালে। তিন তিনবার করোনা আক্রান্ত হয়েছি। তবুও কাজ করে গেছি। কিন্তু এখন তো সরকার কাজ থেকেই ছাঁটাই করে দিয়েছে।” দুকূল হারানো এই সকল যুবকদের এখন সঙ্গী একরাশ হতাশা। তাই এদিন জেলা প্রশাসনের সামনে ক্ষোভ উগড়েছেন। তাদের কাজের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানিয়েছেন, “করোনা সংক্রমন যখন চরমে ছিল তখন সেফ হোম, কোভিড হাসপাতালগুলিতে এদের নিয়োগ করা হয়েছিল নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে। আগস্ট মাস পর্যন্ত এরা কাজ করেছেন। তারপর এদের কাজে রাখার ব্যাপারে সরকারের অনুমোদন মেলেনি। জেলার স্বাস্থ্যদপ্তরের এক্তিয়ার নেই এদের কাজের মেয়াদ বাড়ানোর। কারণ অনুমোদন
না পেলে পারিশ্রমিক কোথা থেকে দেবে?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *