জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৫ জুন: এবার ফলন ভালো হয়েছে। তার ওপর প্রকৃতির চোখ রাঙানি। নির্দেশিকা না আসায় সহায়ক মুল্যে ধান কিনতে অপারগ চালকল কর্তৃপক্ষ। খোলাবাজারে দাম কম। আর তাই সহায়ক মুল্যে ধান বিক্রির দাবিতে রাইসমিলের রাস্তা বন্ধ করে দিল ক্ষুব্ধ চাষীরা। ঘটনাকে ঘিরে চাপা উত্তেজনা ছড়িয়েছে গলসী-১ নং ব্লকের বুদবুদের তিলডাঙা গ্রামে।
ঘটনায় জানা গেছে, গলসী-১ নং ব্লকের বুদবুদের তিলডাঙা মোড় এলাকায় একটি রাইস মিলের রাস্তা বন্ধ করে দেয় স্থানীয় চাষীরা। রাইসমিলের রাস্তায় রীতিমতো পোস্টার বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, ‘তিলডাঙা গ্রামের চাষীদের ধান না কিনলে বাইরের ব্যাবসায়ীদের ধানেট গাড়ি ঢুকতে দেওয়া বন্ধ।’ রাস্তার একপাশে প্ল্যাকার্ড বসিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করা হয়নি। কিন্তু তাতেই ভয়ে কেউ রাইসমিল মুখো হচ্ছে না। এমনকি গ্রামবাসীদের হুঁশিয়ারিতে আতঙ্কে রাইসমিলের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে মিল মালিক কর্তৃপক্ষ।

শেখ জামালউদ্দিন, শেখ হাসিবুল, আশরাফ আলি মন্ডল প্রমুখ স্থানীয় চাষীরা জানান, “ধারদেনা করে বরো ধানের চাষ করেছি। ফলনও ভাল হয়েছে। কিন্তু গত দু মাস ধরে ঝাড়াই করা ধান খামারে পড়ে আছে। খোলা বাজারে দাম কম। ওই দামে বিক্রি করলে চাষের খরচ উঠবে না। রাইস মিল মালিকরা কিনছে না। সহায়ক মুল্যেও ধান কেনা হচ্ছে না। ফলে বিপাকে পড়েছি। তার ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সামনে বর্ষাকাল। বৃষ্টি হলে খামারে পচে নষ্ট হয়ে যাবে ধান।” চাষীদের অভিযোগ, “রাইস মিলের নোংরা জলে ধান জমি নষ্ট হচ্ছে। রাইস মিলের ছাইয়ের দূষণে ওষ্ঠাগত প্রাণ গ্রামবাসীদের। রাইস মিলের দূষণ যখন সহ্য করতে হবে, তখন আমাদের মাঠের ধান কেন কিনবে না মিল মালিক? আমরা সহায়ক মুল্য থেকে কিছু কম মুল্যেও সরাসরি মিল মালিককে ধান কেনার জন্য বলেছি। তাতেও রাজি নন। তাই বাধ্য হয়ে মিলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছি।”
চাষীরা আরও জানান, “বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ব্লক প্রশাসনের কাছেও সহায়ক মুল্যে ধান কেনার আবেদন করেছি। কিন্তু কোনও সদুত্তর পাইনি। এভাবে কেউ না কিনলে ধান নষ্ট হবে। ফলে চরম লোকসান হবে চাষীদের। সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে। আমাদের অনুমান সস্তায় ফঁড়েদের ধান বিক্রি করতে বাধ্য করানোর জন্য এটা কোনও ষড়যন্ত্র।”
যদিও রাইসমিল মালিক ধীরাজ ভট্টাচার্য জানান, “সরসারি চাষীদের কাছ থেকে সহায়কমুল্যে ধান কেনার কোনও নির্দেশিকা আসেনি। তাই তিনি অপারগ। তাছাড়া লকডাউনে গোডাউনে আমন ধান এখনও প্রচুর মজুত রয়েছে। নতুন করে ধান কেনা সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, “চাষীরা যেভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাতে মিলের উৎপাদন বন্ধ। বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে লোকসানের বহর বাড়বে। ব্যাঙ্ক ঋণের কিস্তি মেটাতে সমস্যা হবে। সরকারি ইপিএসসির চাল তৈরি ব্যাহত হবে।”
গলসি-১ নং পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি অনুপ চট্টোপাধ্যায় জানান, “রাইস মিলের পক্ষ থেকে এরকম কোনও অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ আসলে খতিয়ে দেখা হবে। তবে রাইস মিলের নোংরা বর্জ্য জলে চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে, এলাকার চাষীদের অভিযোগ সঙ্গত। খুব শীঘ্রই সহায়ক মুল্যে ধান কেনা শুরু হবে।”
পুর্ব বর্ধমান জেলা কৃষি দফতর সুত্রে জানা গেছে, চলতি মরশুমে ১ লক্ষ ৭২ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে বরোধান চাষ হয়েছিল। কমপক্ষে হেক্টর প্রতি ৫ টন ফলন ধরা হলে ৮ লক্ষ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। গলসী-১ নং ব্লক কৃষি দফতর সুত্রে জানা গেছে, চলতি মরশুমে ব্লকে ১৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বরো ধান চাষ হয়েছিল। ফলন হয়েছে ৭১ হাজার মেট্রিক টন।
পুর্ব বর্ধমান জেলা ফুড কন্ট্রোলার আবির বালি বলেন, “সহায়ক মুল্যে ধান কেনা চলছে। রেজিষ্টার চাষীরা কৃষকবাজারের গাইড লাইন মত তাদের ধান বিক্রি করতে পারবে। তবে যে সমস্ত রেজিস্টার চাষীরা খরিফ মরশুমে আমন ধান বিক্রি করতে পারেনি, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারি গাইড লাইন মেনে চাষীরা সহায়ক মুল্যে ধান বিক্রি করতে পারবে।”
তবে, কয়েকদিন হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে মিলের উৎপাদন চালুর ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি।

