Education Minister, Vidyasagar University, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরব উচ্চশিক্ষামন্ত্রী

পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২৬ সেপ্টেম্বর: পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৭তম জন্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সরব হলেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ থেকে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে বিগত ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অধ্যাপক ও পড়ুয়াদের উদ্দেশে বাংলা ও দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত হয় বিদ্যাসাগর স্মৃতি- বক্তৃতা ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, নীতি আয়োগের সদস্য গোবর্ধন দাস, বিশেষ অতিথি হিসেবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের অধিকর্তা ড. সায়ন ভট্টাচার্য, বিধায়ক শংকর কুমার গুছাইত ও রমাপ্রসাদ গিরি। উপস্থিত ছিলেন জেলার জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণ, পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা- সহ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকরা।

অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দীপক কর এবং রেজিস্ট্রার জয়ন্ত কিশোর নন্দী।

শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন—
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরব হন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রাজ্যে দীর্ঘদিনের বাম শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের সময়কার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গ।

মন্ত্রী অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের আমলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “৩৪ বছর সিপিএম করে, পরে তৃণমূলের চাদর পরে বাংলার বামপন্থীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে গোটা রাজ্যটাকে রসাতলে পাঠিয়েছে।”

তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বিতর্কের আবহ তৈরি হয়। তবে বক্তব্যের মূল সুর ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সামনে রেখে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।

অধ্যাপক ও পড়ুয়াদের এগিয়ে আসার আহ্বান—
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলার ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, অধ্যাপক ও শিক্ষক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- ছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা যেন পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার কাজে এগিয়ে আসেন।

মন্ত্রী বলেন, এই পরিস্থিতিতে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, অধ্যাপক এবং আগামী দিনের প্রজন্মই আশা ও ভরসার জায়গা। তাঁদের হাত ধরেই বাংলাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, এমন মঞ্চ থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক অধ্যাপকের পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু তাঁর মতে, সময় এসেছে সত্যকে সত্য এবং ভুলকে ভুল হিসেবে বলার। তাঁর কথায়, “কখনও তো আমাদের সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে হবে।”

বিদ্যাসাগরের আদর্শে প্রতিষ্ঠান গড়ার আহ্বান—
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পড়ুয়াদের উদ্দেশে হাতজোড় করে আবেদন জানান উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। তাঁর আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয় যেন তার ঐতিহ্য ও মর্যাদা আরও শক্তিশালীভাবে ফিরিয়ে আনে এবং বিদ্যাসাগরের আদর্শকে সামনে রেখে নতুনভাবে এগিয়ে চলে।

তিনি বলেন, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মেন্টর এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ের জন্য গাইডিং ফোর্স হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যাসাগরের নাম ও আদর্শকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির আরও বৃহত্তর ভূমিকা পালন করা উচিত বলেও তিনি জানান।

মন্ত্রী আরও বলেন, বদলে যাওয়া বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন দিশা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক ও পড়ুয়াদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নতুন বাংলা গড়ে তোলার জন্য তিনি শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।

পুরস্কার ও একাধিক কর্মসূচি—
এদিনের অনুষ্ঠানে বিদ্যাসাগর স্মৃতি- পুরস্কারে সম্মানিত করা হয় অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র মিশ্র, অধ্যাপক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অধ্যাপক চিত্ত পান্ডাকে। তাঁদের হাতে বিশেষ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই প্রকাশিত হয় ‘শকুন্তলা’-র বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত সংস্করণ এবং ‘বিদ্যাসাগর রচনা সমগ্র’-র চতুর্থ খণ্ড।

এছাড়াও এদিন মন্ত্রীর হাত ধরে বিদ্যাসাগর মিউজিয়ামের উদ্বোধন এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রিভার্স পার্কের উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যাসাগরের জীবন, কর্ম ও আদর্শকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে অনুষ্ঠানে আশা প্রকাশ করা হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনুষ্ঠান শুরুতে বিলম্ব—
এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক কর্মসূচি নিয়ে উপস্থিত হন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। তবে প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনুষ্ঠান শুরু হতে কিছুটা দেরি হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

বিদ্যাসাগরের জন্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন তাঁর শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও মানবিক আদর্শ নিয়ে আলোচনা হয়, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন। ফলে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অনুষ্ঠান একাধিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *