“তার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ছিল না”, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর জানালেন হাঁসখালির মৃত কিশোরীর মা

স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ১২ এপ্রিল: মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর হাঁসখালির মৃত কিশোরীর মা জানালেন তাঁর মেয়ে অন্তঃসত্তা ছিলেন না। তিনি জানান, গাজনা গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য সমর গয়ালির ছেলে ব্রজগোপাল গয়ালি তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। তাঁর সাথে আর কেউ ছিল কি না তা তিনি জানেন না।

হাঁসখালি গণধর্ষণ কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত ব্রজগোপাল গয়ালিকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে রাণাঘাট আদালত। এছাড়াও মৃতার মা, দুই জ্যাঠা এক গ্রামীন চিকিৎসক ও গ্রামের স্মশান ঘরে থাকা এক পৌড়ের জবানবন্ধি নিয়েছে আদালত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনস্বার্থ মামালাও দায়ের হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে।

মৃতার মায়ের বয়ান অনুয়ায়ী, “সেইদিন সন্ধে বেলা একজন মাঝবয়সি মহিলা তাঁর অসুস্থ মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে এসে হুমকি দেয়, পুলিশ ও কাউকে কিছু জানালে তার ঘর পুড়িয়ে ফেলা হবে। ঐ মহিলার সাথে দুই যুবক বাইক নিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। তিনি এও জানান, রাতের দিকে মেয়ের পেটে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল সেই সময় গ্রামীন চিকিৎসকের কাছ থেকে ঔষধ আনতে গিয়েছিলাম ফিরে এসে দেখি মেয়ে মারা গেছে।

ঘটনার পর মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তারের পর কয়েক জনের নাম উঠে আসে পুলিশি তদন্তে। পুলিশ প্রভাকর পোদ্দার নামে আরও এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মূল অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই দিন প্রভাকর ঘটনাস্থলে ছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন মূল অভিযুক্ত ব্রজগোপাল গয়ালি।

প্রসঙ্গত, ৫ এপ্রিল নদিয়ার হাঁসখালি থানার শ্যামনগর গ্রামে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য সমর গোয়ালির ছেলে ব্রজগোপালের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, তীব্র যন্ত্রণা ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ঐ কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও অভিযোগ ওঠে যে, প্রমাণ লোপাটের জন্য জোড় করে ঐ কিশোরীর মৃতদেহ স্মশানে ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়াই পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীকালে যাতে কোনো প্রমাণ না পায় তার জন্য গোটা শ্মশান ধুয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে।

পুলিশ সূত্রে জানাগেছে, ব্রজগোপাল গ্রেপ্তার হলেও এখনও বেশ কিছু ধন্দ রয়েই গিয়েছে। তার অন্যতম কারণ, সে দিনের ঘটনায় যুক্ত নানা জনের বয়ানে অসঙ্গতি এবং গ্রামের মানুষ কার্যত চুপ করে রয়েছে। এমন কি কারণ ছিল যে, মৃতার পরিবার টুঁ শব্দটিও না-করে তড়িঘড়ি মৃতদেহ দাহ করে দিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ধর্ষণের অভিযোগে ধৃত ব্রজ গয়ালির বাবা সমরেন্দু গয়ালি স্থানীয় পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য। সমরেন্দুর নামে পুলিশের কাছে কোনও অভিযোগ দায়ের করেনি মৃতার পরিবার। তবে রবিবার সকালে ব্রজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাড়িতে নেই।

সোমবার পুলিশ মৃতার বাড়ি থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে সেই মহিলার সন্ধান পায়। মোটর বাইক আরোহী দুই যুবকেরও খোঁজ মেলে। পরে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে পলি বিশ্বাস নামে বছর তিরিশের ওই মহিলা দবি করেন, “মেয়েটির মা মিথ্যা কথা বলছে, আমি কেন হুমকি দিতে যাব? আমার কী স্বার্থ আছে, আমি বরং মেয়েটিকে ভাল ডাক্তার দেখাতে বলে আসি।” পলি এও জানান, তাঁর দিল্লিতে বিয়ে হয়েছে। তিন বছর পর দিন কয়েক আগে বাপের বাড়িতে এসেছেন। ওই দিন সন্ধ্যায় ভাইপোকে সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে পাশের পাড়ায় মামার বাড়ি যাচ্ছিলাম। পাড়ার এক ভাই রাস্তায় বসে থাকা মেয়েটিকে দেখিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে বলে। মেয়েটি বলে, এক দাদার বার্থ-ডে পার্টিতে গিয়েছিল। ওর খুব শরীর খারাপ, প্রচণ্ড মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে। বাড়ি পৌঁছে দিতে অনুরোধ করে।” পলির দাবি, মেয়েটিকে তাঁরই সাইকেলের কেরিয়ারে চাপিয়ে তিনি বাড়ি পৌঁছে দেন। আর পাড়ার সেই ভাই আর তাঁর এক বন্ধু মোটরবাইক নিয়ে তাদের পিছন পিছন আসেন। পলির কথায়, “মোটর বাইকের আলোয় রাস্তা দেখে সাইকেল চালিয়ে মেয়েটির বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছই।”

পুলিশ সুপার সায়ক দাস জানিয়েছেন, “ঐদিন বার্থ-ডে পার্টিতে কতজন ছিলেন, তা জেরা করে দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত ব্রজকে নিয়ে তিন-চার জনের কথা জানা যাচ্ছে। তারা কারা, তাদের ভূমিকা কী ছিল বা আদৌ ছিল কি না, তা দেখা হচ্ছে। যাঁরা বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাদের আজ আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গোপন জবানবন্দি দেওয়ার জন্য। অভিযোগের ভিত্তিতেই গণধর্ষণের মামলা রুজু করা হয়েছে”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *