অবশেষে ছয় দিন বাদে ধরা পড়ল কুলতলির লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ

আমাদের ভারত, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, ২৮ ডিসেম্বর: টানা ছয় দিন পর অবশেষে বাঘ বন্দি হল কুলতলিতে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলিতে গত ছয় দিন আগে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ঢুকে পড়েছিল লোকালয়ে। সেই বাঘের আতঙ্কে ঘুম ছুটেছিল এলাকাবাসীর। অবশেষে মঙ্গলবার বন কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঘকে ঘুম পাড়ানি গুলি ছোড়েন। তিন তিনটি ঘুম পাড়ানি গুলিতে শেষ পর্যন্ত কাবু হয় বাঘ।

গত ২৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার কুলতলির গোপালগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েতের গায়েনের চক এলাকায় বাঘ ঢুকে পড়ে। সুন্দরবনের আজমলমারির জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে নদী টপকে বাঘটি লোকালয়ে প্রবেশ করে বলেই অনুমান বন দফতরের। স্থানীয় মানুষজন প্রথম বাঘের উপস্থিতি লক্ষ্য করে বন দফতরকে খবর দিলে বন কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে বাঘের পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন বাঘ লোকালয়ে ঢুকেছে। সেখানে দুদিন থাকার পর বাঘটি চলে আসে পাশের গ্রাম ডোঙাজোড়া শেখ পাড়া এলাকায়। সেখানে লোকালয় লাগোয়া ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে আশ্রয় নেয় বাঘটি। সেখানে গত শনিবার সকালে কয়েকজন গ্রামবাসী নদীতে কাঁকড়া ধরতে যাওয়ার সময় বাঘের দেখা পান। তাঁরাই বন দফতরকে খবর দিলে বন দফতরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে দেখেন বাঘ এই গ্রামেই রয়েছে।

এরপর গত চারদিন ধরে ডোঙাজোড়া শেখ পাড়ায় বাঘ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে বসে থাকে। বারে বারে ছাগলের টোপ দিয়ে খাঁচা পাতা হলেও তাতে ধরা দেয়নি বাঘ। সোমবার ড্রোন ক্যামেরা উড়িয়ে বাঘের তল্লাশি করে বন দফতর। ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে বাঘের সঠিক অবস্থান জানার চেষ্টা করে তাঁরা। জঙ্গলের মধ্যে ঘুম পাড়ানি গুলি ছুঁড়ে বাঘ ধরার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সোমবার বনদফতরের সমস্ত প্রচেস্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে মঙ্গলবার সকাল থেকে বাঘ ধরার সমস্তরকম পরিকল্পনা করে জঙ্গলে প্রবেশ করেন বন কর্মীরা। একদিকে যেমন দমকলের সাহায্যে জঙ্গলে হোর্ষ পাইপের মাধ্যমে বাঘের গায়ে জল ছিটিয়ে বাঘের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পটকা ফাটানো হয় এদিন সকালে। কিন্তু তবুও জঙ্গলে বাঘের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। জঙ্গলের মধ্যে তিনটি জায়গায় মাচা বেঁধে সেখানে ঘুম পাড়ানি বন্দুক নিয়ে বাঘের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেন বন কর্মীরা। কিন্তু কোনও কিছুতেই বাঘের খোঁজ মেলে না।

অবশেষে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ জঙ্গলে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন বনাধিকারিকরা। অভিজ্ঞ বন কর্মীদের একটি দলকে নাইলনের জালের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। জঙ্গলের ঝোপঝাড় কেটে বন কর্মীরা এগোতে থাকেন। পাশাপাশি অন্যান্য বন কর্মীরা পটকা ফাটানো থেকে শুরু করে প্রবল চিৎকার, আওয়াজ করতে থাকেন। মিনিট পনেরো এই রকম চলার পর প্রবল গর্জন করে জঙ্গলের মধ্যে নড়াচড়া শুরু করে বাঘ। বাঘ নড়াচড়া করতেই মাচা থেকে ঘুম পাড়ানি গুলি ছোড়া হয় তাঁকে লক্ষ্য করে। প্রথম গুলিতেই খানিকটা জখম হয় বাঘ। সাথে সাথে আরও ছোটাছুটি করতে থাকে। বাঘের গতিবিধি নজরে আসতেই আরও দুটি ঘুম পাড়ানি গুলি ছোড়া হয় পর পর। এবার ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে শুরু করে দক্ষিণরায়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়লেই বন কর্মীরা বাঘের মুখে বস্তা চাপা দিয়ে চেপে ধরেন। এরপর জাল দিয়ে বাঘের সারা শরীর জড়িয়ে দেওয়া হয়। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বাঘটিকে একটি খাঁচায় আটকে ফেলেন বনকর্মীরা। এরপর সেই খাঁচা সাড়ে দশটা নাগাদ লঞ্চে চাপিয়ে নদীবক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় বন দফতরের তরফে।

বাঘটিকে আপাতত বনি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তার শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে। বাঘটি একটি পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ বাঘ বলেই জানিয়েছে বন দফতর। বাঘটি সম্পূর্ণ সুস্থ হলে তাঁকে পুনরায় জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে বন দফতর সূত্রের খবর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *