আমাদের ভারত, ২০ জুন: এক চুড়ান্ত রক্তাক্ত ও যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং থেকে নোয়াখালি দাঙ্গার দিনগুলিতে হিন্দু বাঙ্গালিদের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছিলেন গোপাল পাঁঠা। আর গোটা পশ্চিমবঙ্গকে ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্নতা করার গভীর চক্রান্ত একা হাতে রুখে দিয়েছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু বিগত সরকারগুলির ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা ও রাজনৈতিক মদতে ইতিহাসের এই গৌরবজ্জ্বল ও বিষাদময় অধ্যায় এতদিন সাধারণ বঙ্গবাসীর আড়ালে ছিল। সোমবার হুগলির তারকেশ্বরে রাজ্যের প্রথম সরকারিভাবে পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপনের মঞ্চ থেকে এভাবে অতীতের শাসক দলের বিরুদ্ধে সমালোচনায় সরব হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আজ তাঁর বক্তৃতার বেশিরভাগ জুড়েই ছিল বাংলার সেই বিস্মৃতির অতলে চলে যাওয়া ইতিহাস, বাঙালি হিন্দুর অস্মিতা ও আত্মপরিচয়ের কথা।
তারকেশ্বরে মঞ্চে উঠেই বাবা তারকনাথকে প্রণাম করে হর হর মহাদেব ধ্বনি দিয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক হাওয়া ও পরিবেশ নিয়ে নিজের আনন্দ উত্তেজনা চেপে রাখেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলা আজ শৃঙ্খল মুক্ত। চারিদিকের বাতাসে আজ এক নতুন সুগন্ধ। এক তাজা হাওয়া অনুভূত হচ্ছে। এই পরিবর্তন আপনাদের ভালো লাগছে তো? প্রথমবার এই পবিত্র দিবসে বাংলার এই নবজাগরণ আমি প্রত্যক্ষ করছি।
তৃণমূল জমানার সমালোচনা করে তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস দুর্নীতির যে গভীর গর্ত খুঁড়ে রেখে গিয়েছে তা ভরাট করতে কিছুটা সময় নিশ্চয়ই লাগবে। তবে রাজ্যের ডবল ইঞ্জিন সরকার এখন দ্বিগুণ গতিতে কাজ শুরু করেছে। উন্নয়নে এসেছে নতুন গতি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করতে কৃষি, মৎস্য পালন, গ্রামীণ রাস্তাঘাটের পরিকাঠামো উন্নয়নে জোয়ার এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নে অতীতের ঘাটতি পূরণে ডাবল ইঞ্জিন সরকার দ্রুত গতিতে কাজ করছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে যেসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন থমকে ছিল সেগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, রাজ্য এখন উন্নয়নের নতুন অধ্যায় প্রবেশ করতে চলেছে। ভবিষ্যতে আরও দ্রুত অগ্রগতির সাক্ষী হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, দেশ ভাগের সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, কংগ্রেস শাসনকাল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আমলে তোষণের রাজনীতি রাজ্যের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের ভূমিতে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিবর্তে বিদেশি চিন্তা ধারা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, কংগ্রেস- বামফ্রন্ট- তৃণমূল একের পর এক সরকারের আমলে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়নি। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
এরপরেই ১৯৪৬ সালের কলকাতার হিংসা যা দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নামে পরিচিত এবং নোয়াখালি দাঙ্গার প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখনকার মানুষ নিজের মাতৃভূমিকে খন্ড বিখন্ড হতে দেখেছে। গোটা পশ্চিমবঙ্গকে, ভারতবর্ষ থেকে আলাদা করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার এক সুগভীর চক্রান্ত গড়ে উঠেছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে না দাঁড়ালে আজ মানচিত্রে এই পশ্চিমবঙ্গের কোনো অস্তিত্বই থাকতো না। কংগ্রেস লড়াইয়ের ময়দানে কার্যত হালই ছেড়ে দিয়েছিল। বাঙালি নিজের মাতৃভূমিকে টুকরো হতে দেখেছে ঠিকই কিন্তু নিজের অস্মিতা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়কে কখনো বিলুপ্ত হতে দেয়নি।
মোদী আরো অভিযোগ করেন, যখন সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ বানানোর চক্রান্ত তীব্র রূপ নেয়, তখন তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব চক্রান্তকারীদের সামনে কার্যত হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিল, তারা লড়াইয়ের মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সেই চরম সঙ্কটের সময় অকুতোভয় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গর্জে উঠে ঘোষণা করেছিলেন, কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানের অংশ হবে না বাংলা। আর তাঁর জেদ ও ঐতিহাসিক দাবি থেকে বাংলায় সূচনা হয়েছিল হিন্দু হোম ল্যান্ড মুভমেন্টের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশভাগের সময় কংগ্রেস বাংলাকে একপ্রকার অনাথের মতো ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলায় শুরু হয় তোষণের কুৎসিত রাজনীতি।

