রজত মুখার্জীর কলমে
শুধু তোমার বাণী নয় গো, হে বন্ধু, হে প্রিয়,
মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিয়ো॥
আমাদের ভারত, ২৩ সেপ্টেম্বর: ঝাড়গ্রাম জঙ্গলমহলের অন্তর্গত গোপীবল্লভপুর ব্লকের অধীনস্থ ছোট্ট একটি জনপদ কুলিয়ানা গ্রাম। সবুজ বনানীতে মোড়া কাশফুলে ভরা ওড়িশার সীমান্ত সংলগ্ন এই গ্রাম আজ বঙ্গবাসীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, কারণ ১৯৬৪ সনের ১লা আগস্ট ঘোষ পরিবারের ঘর আলো করে এখানেই জন্মগ্রহণ করেন বিরল প্রতিভা সম্পন্ন বঙ্গমাতার দামাল ছেলে দিলীপ ঘোষ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কুলিয়ানা গ্রামের বুক চিরে কলকল রবে বয়ে চলেছে শান্ত অথচ স্ফীত সুবর্ণরেখা, আর নদীবিধৌত এই অঞ্চলে নদী যেন নদীতীরের মানুষগুলোর জীবনের স্বরলিপি। ঠিক যেমন বিভিন্ন কাব্যিক ব্যঞ্জনায় নদী পেয়েছে ভিন্ন এক বহুমাত্রিকতার বিচিত্র রূপ, একইভাবে অনেক বর্ণের রেখাঙ্কন হলেন আমাদের দিলীপ দা। “নদী স্রোতস্বিনী তাই নদী বেগবান। জীবনে দ্বন্দ্ব আছে, অঙ্গীকার আছে, আছে চোখে স্বপ্ন তাই জীবন বৈচিত্র্যময়” …….. এই আপ্তবাক্যের সেরা বিজ্ঞাপন আমাদের দিলীপ ঘোষ। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে জন্মেও যে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করা যায়, দিলীপ দা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
২০১৫ সাল অস্তমিতপ্রায়, সমগ্র দেশ তখন মোদী ম্যানিয়ায় আচ্ছন্ন, অথচ এই বাংলার বুকে দুরবীক্ষণ যন্ত্রেও এক আধটা বিজেপি কর্মী খুঁজে পাওয়া ছিল নিতান্তই কষ্টকল্পিত ব্যাপার। তথাকথিত সাম্যবাদের স্বঘোষিত ঠিকাদার আমাদের বঙ্গসমাজে উগ্র হিন্দুত্ববাদের মিথ্যে অপবাদে বিজেপির অস্পৃশ্যতা তখনও সর্বজনগ্রাহ্য। লোকদেখানো মেকি ধর্ম নিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে সংখ্যালঘুদের পদলেহন করা বাঙালীর কৌলিণ্যের সাথে বিজেপির নীতি আদর্শ সম্পৃক্ত করা ছিল অসম্ভবেরই নামান্তর। এমন সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তে নভেম্বরের ১১ বা ১২ তারিখ রাজ্য বিজেপির চালকের আসনে অধিষ্ঠিত করা হয় গোপীবল্লভপুরের অখ্যাত দিলীপ ঘোষ’কে, যার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সে সময় সাকূল্যে মাত্র কয়েকটি মাস বা আরও কম।

মাত্র কয়েকটি মাসের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়া দিলীপবাবুর সেদিনের পুঁজি বলতে ছিল সততা, নিষ্ঠা, দায়বদ্ধতা ও একাগ্রতা। হার না মানা অদম্য জেদ ও নাছোড়বান্দা মনোভাব ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যায় অমিতবিক্রম অকুতোভয় দিলীপ দাকে–তার অভীষ্টের লক্ষ্যে। রাজ্য জুড়ে প্রবল ভাবে বিস্তার লাভ করে দিলীপদার নেতৃত্বাধীন বিজেপির সংগঠন যা একবাক্যে প্রশংসনীয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অজ্ঞাতকুলশীল দিলীপবাবু অচিরেই পরিণত হন রাজনৈতিক মহীরুহে। কলকাতার তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আঁতেল সমাজের যাবতীয় সমালোচনাকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ অননুকরণীয় নিজস্ব কায়দায় দলকে পরিচালিত করে দিলীপদা বঙ্গ বিজেপির ইতিহাসে সংযোজন করেন নতুন এক অধ্যায়ের, যা আগামী শতাব্দীকাল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
অমিতবাক দিলীপদা একাধিক বার তাঁর আলটপকা মন্তব্যের জন্য সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হলেও, রাজ্য রাজনীতিতে তিনিই যে বিজেপিকে পাদপ্রদীপের আলোয় এনে দিয়েছেন, এ ব্যাপারে তার ঘোরতর বিরোধীরাও দ্বিমত পোষণ করেন না। “হিন্দু কে হিন্দু থাকতে দিন আর মুসলমান কে মুসলমান, খিচুড়ি পাকাবেন না,” লাইভ টিভি ক্যামেরার সামনে বসে এমন স্পষ্ট কথাবার্তা বলার স্পর্ধা কেবল দিলীপ ঘোষই দেখাতে পারেন। কারণ তিনি অসমসাহসী, তিনি নির্লোভ এবং নিজের বিবেকের কাছে অত্যন্ত সৎ ও পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসেন। তৈলমর্দনে অনভ্যস্ত, পদের মোহ নেই, কাউকে রেয়াত করেন না, তাই তো অবিশ্বাস্য এই প্রামাণিকতা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সাদা’কে সাদা, কালো’কে কালো বলতে অভ্যস্ত দিলীপবাবুর সহজাত নেতৃত্বের গুণেই আজ বিজেপির ভান্ডারে ১৮ জন সাংসদ ও ৭৭ জন বিধায়ক, যা বঙ্গ বিজেপির ইতিহাসে অদ্যাবধি সর্বকালীন এক রেকর্ড। তথাকথিত শহুরে বাবুদের মত কারণে অকারণে ইংরিজি বলে নিজেকে এলিট বা কুলীন প্রতিপন্ন করতে তৎপর হননি বা হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি আমাদের দিলীপ দা। কিন্ত দলের প্রয়োজনে দলীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে শ্মশানে যেতেও প্রস্তুত ছিলেন, যে মানসিকতা উচ্চশিক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। এখানেই দিলীপদার বিশেষত্ব, যা আমার মধ্যে তাঁর প্রতি এক প্রবল অনুরাগ ও আনুগত্যের জন্ম দিয়েছে। সিপিএম, কংগ্রেসের মত লব্ধপ্রতিষ্ঠ দলগুলোর শরশয্যা সুনিশ্চিত করে একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে বিধানসভার কক্ষে প্রবেশাধিকার পাওয়া, দিলীপবাবুর কুশলী নেতৃত্বের স্বপক্ষে এক প্রামাণ্য দলিল।

দায়িত্ব আসে, আবার কালের আপন নিয়মেই চলেও যায়, এটাই বিজেপির সংবিধানসিদ্ধ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দিলীপদাও ব্যতিক্রম নন। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অতএব নবাগত কাউকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে চলে যেতেই হত। কিন্ত তিনি তাঁর কর্মকালে রাজ্য বিজেপিকে যে অসামান্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন, তা আমার মত কোটি কোটি কর্মী সমর্থক আজীবন কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করবে। এক্ষেত্রে ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলির উপমা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে, যিনি তাঁর নিজের অধিনায়কত্বে বিশ্বকাপটা জয় করতে না পারলেও, টিম ইন্ডিয়াকে চোখে চোখ রেখে লড়াইটা করতে শিখিয়ে দিয়েছিলেন এবং ধোনির জন্য বিশ্বকাপ জেতার পথটা সুগম ও প্রসস্ত করে গিয়েছিলেন।
রাজ্য সভাপতি পদে দিলীপ ঘোষের মেয়াদ উত্তীর্ণের সাথে সাথেই বঙ্গ বিজেপির একটা স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল। রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প এবং দিলীপদা কাঙ্খিত লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ অবধি অভীষ্ট চরিতার্থে সমর্থ হননি, যা আমায় ব্যথিত করে। মানুষটিকে কাছ থেকে দেখেছি, মানুষটার সাথে কিছুটা মেলামেশার সুযোগ পেয়েছি যা আমাকে আজীবন কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করবে। আমার সামান্য জ্ঞানে এটুকু বলতে পারি যে, রাজনীতিতে এত সৎ, নির্লোভ ও নিষ্ঠাবান মানুষ বিরল। স্বাভাবিক ভাবেই দিলীপদা যুগের অবসানের সংবাদটা পাওয়া ইস্তক মনটা কিছুটা ভারাক্রান্ত। তাই বিগত দু’দিন যাবত নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নিয়েছিলাম। সেদিনের পর আজই প্রথম রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া দাদাকে ফোন করলাম। আমি কৃতজ্ঞ ও আপ্লূত যে বিগত বছর দু’য়েক ওনার জন্য কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, যা আজীবন আমার স্মৃতিতে অম্লান থাকবে। দাদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি পদে উন্নীত হওয়ায় গৈরিক অভিনন্দন। তুমি তোমার যোগ্যতার পুরস্কার পেয়েছ দাদা। আমার দিলীপদার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত অনুরাগ ও অকৃত্রিম আনুগত্য নিয়ে যারা ঠোঁটের কোণে বঙ্কিম হাসি ঝুলিয়ে আমাকে ক্রমাগত তীর্যক প্রশ্নে তীরবিদ্ধ করে গিয়েছেন, আজ তাদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। আমি পরিক্রমার রাজনীতি করার থেকে পরাক্রমের রাজনীতিতে বেশি পারদর্শী, তাই দিলীপদা আমার রাজনৈতিক জীবনে গুরু দ্রোনাচার্য্য হলেও আমি একলব্য হয়েই রয়ে গিয়েছি। মান, অভিমান, দুঃখ, অবসাদ যে আমাকে কখনও গ্রাস করেনি, এমনটা নয়। কিন্ত তার জন্য আমার আনুগত্যে কখনোই বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। যাকে ভালোবেসেছি, তাঁকে আজীবন ভালোবাসব এবং তার হিতে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দেব, এটাই রজত মুখার্জী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

উপসংহারে বলতে চাই, আমি আক্ষরিক অর্থেই দৃঢ় প্রত্যয়ী যে নবনিযুক্ত সভাপতি মাননীয় ডক্টর সুকান্ত মজুমদার অনায়াস দক্ষতায় নিজেকে দিলীপদার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে প্রমাণ করতে সমর্থ হবেন। হয়তো বা অগ্রজকে ছাপিয়ে গিয়ে স্থাপন করবেন অনন্য নজির। সুকান্তদা শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত, মার্জিত ও রুচিশীল মানুষ। বয়সে নবীন, মিতভাষী, প্রতিশ্রুতিবান সুকান্তদা দীর্ঘদিন সংঘের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিজেপির ভাবধারার সাথে ভীষণ ভাবে সম্পৃক্ত। অতএব তাঁর হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গবাসীর স্বপ্ন সাকার হবে। আমি আশা রাখি, দিলীপ দা যেখানে শেষ করলেন ঠিক সেখান থেকেই শুরু করে দলকে আরও অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবেন সুকান্তদা, যতক্ষণ না লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে। নতুন রাজ্য সভাপতিকে নিরন্তর শুভ কামনা ও জাতীয়তাবাদী গৈরিক অভিনন্দন।

