প্রসঙ্গ দেউচা-পাঁচামি! রাজ্যের শিল্পমন্ত্রীর কাছে এসইউসিআই (সি) প্রতিনিধিদল

আমাদের ভারত, কলকাতা, ১৫ ফেব্রুয়ারি: দেউচা-পাঁচামি খনি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বক্তব্য জানাতে মঙ্গলবার রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করেন এস ইউ সি আই-এর (কমিউনিস্ট ) এক প্রতিনিধি দল।

প্রাক্তন সাংসদ তথা দলের অন্যতম কর্মকর্তা তরুণ নস্কর এই প্রতিবেদককে জানান, পার্থবাবু পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ, সম্প্রতি পুলিশ অত্যাচার, চাকুরি দেওয়ার সরকারি প্রস্তাব এবং মহিলাদের ক্ষতিপূরণ প্রভৃতি সম্পর্কিত আমাদের প্রস্তাবের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীকে নোট পাঠাবেন বলেছেন।

তরুণ নস্কর জানান আমরা মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে একটি স্মারকলিপি শিল্পমন্ত্রীকে দিই। তাতে বলা হয়েছে, জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পর্যবেক্ষণে জানা গিয়েছে, ডেউচা-পাঁচামি ভারতের বৃহত্তম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা ব্লক। এখানে ১২০০ ফুট মাটির নিচে উন্নত মানের কয়লা এবং তার উপরিভাগে উৎকৃষ্ট ব্যাসল্টের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ সঞ্চিত আছে। সঞ্চিত সম্পদ উত্তোলনের জন্য খনি প্রকল্পের কাজ শুরু করার কথা আপনি গত ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ বিধানসভায় এবং গত ৩১ জানুয়ারি, ২০২২ প্রশাসনিক সভায় ঘোষণা করেছেন।

প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের জনগণের সম্পদ, এই সম্পদ জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে এবং এর সুফল যাতে এলাকাবাসীর কর্মসংস্থান সহ সকল প্রকার উন্নয়নে কাজে লাগে তা গুরুত্ব সহকারে সুনিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সেক্ষেত্রে এলাকার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার প্রশ্নটিই অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ যা আপনি ঘোষণা করেছেন তা অতি নগণ্য।

যেখানে বর্তমানে ওই এলাকায় জমি হস্তান্তর হচ্ছে ২৫-৩০ লক্ষ টাকায়, সেখানে আপনার ঘোষণা অনুযায়ী বরাদ্দ হয়েছে ১০-১৩ লক্ষ টাকা প্রতি বিঘা। অথচ বলা হচ্ছে জমির নাকি তিনগুণ দাম দেওয়া হচ্ছে।

চাকরির প্রশ্নে কেবল পুলিশ কনস্টেবলের কথা বলা হয়েছে। অথচ ওখানে উচ্চশিক্ষিত, বিএড করা, এমনকি বি টেক পাশ করা আদিবাসী বেকার ছাত্র আছে। সেক্ষেত্রে কেবল কিছু পুলিশের চাকরি নয়, যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেকের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কোনও প্রকল্প ঘোষিত হয়নি, তা অবশ্যই করতে হবে। রুক্ষ, পাথুরে এলাকায় টিউবওয়েল বসানোর খরচ ধরা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার টাকা, যা চূড়ান্ত অবাস্তব। এর মধ্য দিয়ে সরকার বাস্তবে পানীয় জল সরবরাহের দায়িত্ব অস্বীকার করছে।

বলা হয়েছে, ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে সর্বমোট ৫০০ দিনের কাজ দেওয়া হবে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের পর সকলের কাজ দেওয়ার দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছেন। কৃষিকাজ যারা করেন তাদের এককালীন ৫০,০০০ টাকা প্রদানের ঘোষণা হয়েছে। এই টাকায় কৃষিকাজ হারিয়ে কোনও মানুষের সারা জীবন চলতে পারে? ফলে, এগুলি নামমাত্র খয়রাতি সাহায্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নাই যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং এই রাজ্যেও এই ধরনের বহু প্রকল্পে পুনর্বাসন ইত্যাদি প্রসঙ্গে সরকারি ঘোষণার সাথে বাস্তবের ফারাক ইতিপূর্বে ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখানেও তা নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে প্রবল আশঙ্কা বিরাজ করছে।

আপনি ঘোষণা করেছেন কাউকে জোর করে উচ্ছেদ করা হবে না। কিন্তু বাস্তব হল, সরকারের ভূমিকায় আশঙ্কিত মানুষদের জব্দ করার জন্য সশস্ত্র পুলিশ এবং সন্ত্রাস বাহিনী এলাকায় নামানো হয়েছে। গত ২৩শে ডিসেম্বর,২০২১ দেওয়ানগঞ্জ গ্রামে আদিবাসী মহিলাদের উপর পুলিশ এবং সমাজবিরোধীদের বর্বরোচিত হামলা আপনার নিশ্চয়ই অজানা নয়। এই ঘটনার বিরুদ্ধে সমস্ত স্তরের মানুষ নিন্দা করে অপরাধীদের শাস্তি দাবি করলেও প্রশাসনের নিশ্চুপ ভূমিকা আপনার বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে না।

ওই প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্তমান অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞানের অগ্রগতির সময়ে পরিবেশবিদ, খনি বিশেষজ্ঞ, ভূ-বিজ্ঞানী, কৃষি বিজ্ঞানীরা খোলামুখ খনির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। অথচ প্রকল্পের প্রস্তাবনায় এখনো সেই খোলামুখ খনির কথাই বলা হচ্ছে। তার ফলে যেমন বহু জমি নষ্ট হবে, বহু পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়বে, আবার ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ ইত্যাদির ক্ষতি হবে মারাত্মক। প্রচুর পরিমাণ বনাঞ্চল ধ্বংস হবে।

যে পরিমাণ ধূলো-বালি, কয়লার গুঁড়ো উড়বে, তাতে প্রকল্প এলাকার বাইরেও ফসলি জমি বন্ধ্যা হবে। তাই প্রকল্প এলাকা সহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির হাজার হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা, বাঁচা-মরার সমস্যার সুরাহা না করে খননের কাজ কোনভাবেই শুরু করা চলবে না।

আপনি ঘোষণা করেছেন প্রথমে সরকারি জমিতে কাজ শুরু হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, সরকারি জমিতেও খনন কাজ শুরু করলে আশেপাশে বসবাসরত পরিবারগুলির ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে এমনিতেই তারা উচ্ছেদ হয়ে যাবে। অনেকেরই আশঙ্কা, এটি একটি অভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা। আশাকরি আপনার সরকার এই অমানবিক পথ গ্রহণ করবে না।

রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ৬ জনের এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রাক্তন সাংসদ তরুণ মণ্ডল, প্রাক্তন বিধায়ক তরুণ নস্কর, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অমল মাইতি, রাজ্য কমিটির সদস্য বিশিষ্ট ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় ও বীরভূম জেলা সম্পাদক মদন ঘটক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *