রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসার মামলায় বীরভূম ও আউশগ্রামের ৬ তৃণমূল নেতাকে জেরা সিবিআইয়ের

জয় লাহা, আমাদের ভারত, দুর্গাপুর, ৩০ মে: শহরে মুখ্যমন্ত্রী রাত্রিবাস করছেন। ভোট পরবর্তী হিংসার মামলায় ওই শহরে তলব করে জেরা করা হল ৬ তৃণমূল নেতাকে। এমনই নজির বিহীন ঘটনার সাক্ষী রইল শিল্পশহর দুর্গাপুর। ভোট পরবর্তী কোনো হিংসার ঘটনা ঘটেনি বলে সাফাই দিলেন আউশগ্রাম-২ ব্লক তৃণমূল কার্যকরী সভাপতি অরূপ মির্ধা। 

প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে ২ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হতেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় হিংসার ঘটনার অভিযোগ ওঠে। একইসঙ্গে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে আউশগ্রামের দেবশালা ও প্রেমগঞ্জ গ্রাম। হিংসার আগুনে দগ্ধ হয় দেবশালার কাঁকোড়া আদিবাসী পাড়া। ভাঙ্গচুর, তছনছ করা হয় বাড়ির জিনিসপত্র। অভিযোগ, আস্ত গোটা গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঢুকে ভাঙ্গচুর, তান্ডব চালানো হয়। বাড়ির জিনিস পত্র ভাঙ্গচুর, বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রান্না করা খাবার নষ্ট করে দেওয়া হয়। বোমাবাজি করা হয় বলে অভিযোগ। আতঙ্কে অসহায় গ্রামবাসীরা নিরন্ন হয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। জঙ্গল দিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামে আশ্রয় নেয় অসহায় গ্রামবাসীরা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ডিসি অভিষেক গুপ্তার নেতৃত্বে বুদবুদ ও কাঁকসা থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। নামে র‍্যাফ, কমব্যাট ফোর্স। দমকলের দুটি ইঞ্জিন গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে। ঘটনাস্থলে একটি বোমা উদ্ধার হয়।

ওইদিন রাতে হিংসার আগুন থেকে রেয়াত মেলেনি জঙ্গলমহলের আউশগ্রামের প্রেমগঞ্জে বিজেপি কর্মীদের। প্রেমগঞ্জের বাগদি পাড়ার প্রায় ২৮ টি পরিবার বছর সাতেক ধরে বিজেপি করছিলেন। বিধানসভা ভোটেও সামিল ছিলেন। কিন্তু গত ২০২১ সালের ২ মে বিধানসভার ফলফল ঘোষণা হতেই তাদের ওপর অমানবিক আক্রমন শুরু হয় বলে অভিযোগ। বাড়ি ঘর ভাঙ্গচুর, লুট, এমনকি গ্রামের মহিলাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন হয় বলে অভিযোগ। চাষের জমিতে থাকা সাবমার্শিবল পাম্প পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এককথায় গ্রামবাসীদের নিঃস্ব করে দেওয়া হয়। আক্রান্ত বিজেপি কর্মীরা আতঙ্কে দু’মাস গ্রামছাড়া ছিলেন। কেউ ভিন জেলায় আত্মীয়ের বাড়িতে। কেউ পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভাতকুন্ডার এক প্রান্তে তাঁবু খাটিয়ে দিনযাপন করছিলেন। হিংসার ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরানো শুরু হয়। গতবছর জুন মাসে বেশ কিছু পরিবার ঘরে ফেরে। কিন্তু তারপরও প্রেমগঞ্জ গ্রামের সুভাষ বাগদি, বারুপদ বাগদি, ভিম বাগদি, কালিপদ বাগদি, মুক্তোসোনা বাউরি, সুশীল বাউরি গ্রামের বাইরে ছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, “ঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। লুট করে নিয়েছে বাড়ির যাবতীয় সামগ্রী। রান্না করে খাবার হাঁড়ি কড়াইটুকুও নেই। ভাঙ্গচুরের পর বাড়ির সামন্য অস্তিত্বটুকুও নেই। থাকার মতো পরিস্থিতি নেই বাড়িতে।” যদিও পরবর্তীকালে তারা গ্রামে ফেরে এবং নতুন করে বাঁচার রশদ জোগাড় করে।

ওইসব ঘটনায় আদালতের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু করে। সোমবার সকালে দুর্গাপুরে এনআইটির গেস্ট হাউসে অস্থায়ী ক্যাম্পে তলব করে পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম-২ ব্লকের তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যকরী সভাপতি আহমেদ সামস তাবরিজ ওরফে অরূপ মির্ধা, বীরভূমের মহম্মদ বাজারের তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি তাপস সিনহা সহ আরও কয়েকজন তৃণমূল নেতাকে।

জানাগেছে, রবিবার দিন সকলকে সোমবার সিবিআই ক্যাম্পে হাজির হাওয়ার নোটিশ পাঠানো হয়। সেইমতো এদিন সকাল দশটা নাগাদ দুর্গাপুরের অস্থায়ী সিবিআই ক্যাম্পে হাজির হন নোটিশ পাওয়া তৃণমূল নেতারা। রবিবার থেকে দুর্গাপুর এনআইটি’র অতিথি শালায় অস্থায়ী ক্যাম্পে ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনার জেরা শুরু করেন সিবিআই আধিকারিকরা।

এদিন দীর্ঘ সময় ধরে চলে জিজ্ঞাসাবাদের পালা। জিজ্ঞাসাবাদের পর বেশ কয়েকজন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা বাইরে বেরিয়ে জানান তাদের চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছে। আউশগ্রাম-২ নং ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যকরী সভাপতি অরূপ মির্ধা অবশ্য সাফাই দেন, “আউশগ্রামে ভোট পরিবর্তী কোনো হিংসার ঘটনা ঘটেনি। চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছে। দিনরাত ২৪ ঘন্টা জনগণের সেবার জন্য কাজ করি। সিবিআই যা কিছু জিজ্ঞাসা করেছে, তার উত্তর দিয়েছি। আগামী দিনে ফের সিবিআই তলব করলে অবশ্যই সহযোগিতা করব।” 

যদিও আউশগ্রাম তথা পূর্ব বর্ধমান জেলার বিজেপি নেত্রী কলিতা মাজি অবশ্য বলেন, “ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। রাজ্য পুলিশ অভিযোগ নেয়নি। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে মামলা হয়। সেই মামলার প্রেক্ষিতে সিবিআই অরূপ মির্ধাকে জেরা করেছে। তবে যারা হিংসার ঘটনায় জড়িত, তাদের আইনানুগ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”  

বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লক তৃণমূল সভাপতি তাপস সিনহা বলেন, “গত ২০২১ সালের ২ মে আমার ফোন থেকে জেলা সভাপতি অনুব্রত মন্ডলের কাছে দুবার ফোন হয়েছিল। সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছিল।” অন্যদিকে দুর্গাপুরের সিবিআই’য়ের অস্থায়ী ক্যাম্পে চলা জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলের ছিল টানটান উত্তেজনা। শহরে তৃণমূল নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পুরুলিয়া সফরের আগে রাত্রিবাস করেছেন দুর্গাপুরে। স্বাভাবিকভাবে সিবিআইয়ের এই জেরায় বিস্তর শোরগোল পড়েছে রাজনৈতিক মহলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *