দেউচা-পাঁচামির কয়লা খনি প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আগামী ২০শে জনসভার ডাক

আমাদের ভারত, ৮ ফেব্রুয়ারি: দেউচা-পাঁচামি-হরিণশিঙ্গা-দেওয়ানগঞ্জ অঞ্চলে প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল করার দাবি তুলল বীরভূম জমি, জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতি বাঁচাও মহাসভা। প্রতিবাদের ভিত সুদৃঢ় করতে, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি দেওয়ানগঞ্জ গ্রামে জনসভার ডাক দেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ওই সংগঠনের পক্ষে প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়, “দেউচা-পাঁচামি- হরিণশিঙ্গা- দেওয়ানগঞ্জ অঞ্চলে প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্পের জন্য জোর করে কোনো জমি না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্ত বাস্তবে বীরভূম জেলার পুলিশ প্রশাসন ও শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস নানারকম ছল চাতুরি, তথ্যের কারচুপি, হুমকি এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। স্থানীয়রা ‘স্বেচ্ছায়’ জমি দিয়ে দিচ্ছে বলে একটি বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। বাস্তবে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কয়লা খনির বিরুদ্ধে।

দেউচা-পাঁচামি-হরিণশিঙ্গা-দেওয়ানগঞ্জ অঞ্চলে কয়লা খনি প্রকল্পের বিরোধিতায় গড়ে উঠেছে স্থানীয় সাঁওতাল ও বাঙালি গ্রামবাসীদের আন্দোলনের যৌথমঞ্চ “বীরভূম জমি, জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতি বাঁচাও মহাসভা”। এই মহাসভা প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্পের সার্বিক বিরোধিতা করছে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার এবং জনগণের সামনে মহাসভা নিম্নলিখিত বক্তব্য তুলে ধরছে: 

১। আইন অনুযায়ী যে কোনো প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার প্রথম ধাপ প্রস্তাবিত প্রকল্প অঞ্চলের মানুষের সম্মতি নেওয়া। অথচ দেউচা-পাঁচামি-হরিণশিঙ্গা-দেওয়ানগঞ্জ অঞ্চলে কয়লা খনি প্রকল্প হওয়া উচিৎ কি না, সেই নিয়ে স্থানীয় মানুষের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে গ্রামসভা বা গ্রাম সংসদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। রাজ্য সরকার এবং শাসক দল উপর থেকে যা চাপিয়ে দিচ্ছে তাই সকলকে মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে, না হলে পুলিস-প্রশাসনের দমন-নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। এইরকম অগণতান্ত্রিক পন্থায় কয়লা খনি প্রকল্প শুরু করার আমরা তীব্র বিরোধিতা করছি।

২। কয়লা খনি হবে এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলে নিয়েছে। তারপর সেই সিদ্ধান্ত সরকার স্থানীয় মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। স্থানীয় মানুষের মতামত না নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য বিধানসভায় ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ ঘোষণা করে দিয়েছেন। এই চাপিয়ে দেওয়া কয়লা খনির সিদ্ধান্ত এবং তথাকথিত ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের প্যাকেজ সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামবাসী সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ আমরা কোনো কিছুর বিনিময়েই জমি থেকে উচ্ছেদ হতে রাজি নই। 

৩। প্রস্তাবিত কয়লা খনি বাস্তবায়িত করতে হলে এলাকার পাঁচ হাজারের উপর পরিবারকে উচ্ছেদ হতে হবে, যাদের অধিকাংশই আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু, এছাড়াও দলিত এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির পরিবারও আছে। প্রকল্প এলাকার এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বহু গ্রাম, গঞ্জ ও শহরের আকাশ-বাতাস, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ‍্য বিপর্যস্ত হবে এবং সামাজিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। প্রকল্প অঞ্চলের বাইরের বহু দূর পর্যন্ত নদী, নালা এবং কৃষিক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই ক্ষতির ক্ষতিপূরণের টাকা বা চাকরির বিনিময়ে কিছুতেই হতে পারে না।

৪। নতুন কয়লা খনি থেকে আরও দুই শত কোটি টন কয়লা তুলে পোড়ালে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। জলবায়ু সঙ্কটের ফলে গোটা বিশ্বজুড়ে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ আর কয়লা খনি এখন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে কোনো নতুন কয়লা খনির আর প্রয়োজন নেই বলেই আমরা মনে করি। প্রকৃতি বিরোধী কয়লা খনি প্রকল্পের পিছনে দশ হাজার কোটি টাকা খরচ না করে রাজ্য সরকার এই অর্থ সৌর, বায়ু ইত্যাদি পরিবেশ বান্ধব, বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচা করলে জনগণের মঙ্গল হবে। 

৫। গ্রামবাসী মহিলাদের লাঠিপেটা এবং নির্যাতন করে, ভয় দেখিয়ে, জমি দখলের যে অপচেষ্টা মহম্মদবাজার থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই করেছে, তার বিরুদ্ধে আমরা আইনি পদক্ষেপ নিতে চলেছি।

৬। দেউচা- পাঁচামি- হরিণশিঙ্গা- দেওয়ানগঞ্জ অঞ্চলে প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল করার দাবিতে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি, বেলা ১টা থেকে দেওয়ানগঞ্জ গ্রামে মহাসভার পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদী জনসভার ডাক দেওয়া হচ্ছে। এই দাবির স্বপক্ষে দাঁড়ানো সমস্ত প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তি এবং ব্যক্তিদের এই সভায় আমরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

বীরভূম জমি, জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতি বাঁচাও মহাসভার পক্ষ থেকে আবেদন করেন লক্ষ্মী রাম বাস্কে, মাইনামতি সোরেন, জগন্নাথ টুডু, গণেশ কিস্কু, হপণমই হেমব্রম, সুকল মুর্মু, মাকলু কিস্কু, বুধি হাঁসদা, সাদি হাঁসদা, রতন হেমব্রম, মোহন মন্ডল, লক্ষ্মী মুর্মু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *