অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৩১ মে: সাধারণভাবে অনুজ্ঞা ছাড়া অন্যান্য ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার ব্যবহার নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়। যাব না যাবো? খাব না খাবো?
প্রবীন শিক্ষক এবং ফেসবুকে ‘অক্ষর শুদ্ধ বানান ও ভাষাচর্চা‘ গ্রুপের স্বপন ভট্টাচার্যের মতে, “এই ও-কারের ব্যবহারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং ঢাকা বাংলা একাডেমি এবং সেই মতো নির্দেশও তাদের পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশে আপত্তিকর কিছু নেই বলেই আমার ধারণা। কিন্তু সেই সঙ্গে আবার বলা হল যে সমস্ত ক্ষেত্রে অর্থ বিভ্রাটের সম্ভাবনা আছে সেখানে ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার দেওয়া যেতে পারে। যেমন: ‘হলো’, ‘হতো’। এই বিকল্প ব্যবস্থাটিই আমার মতে আপত্তিকর।
অসংখ্য বাংলা শব্দ আছে (ক্রিয়া এবং অন্যান্য পদ) যেখানে অর্থ বিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকেই। সেই সব জায়গায় পুরো বাক্যে সেই শব্দের প্রয়োগ দেখে তার অর্থ নির্ধারণ করতে হয়। অনেক সময় পুরো বাক্যটি পড়েও সেই শব্দের সঠিক অর্থ বোঝা যায় না। পুরো অনুচ্ছেদ বা পুরো লেখাটা পড়ার পরেই সেই শব্দের অর্থ বোধগম্য হয়।
‘ঘরে চাল নেই’। এই বাক্যে ‘চাল’ শব্দের অর্থ কী? ঘরে ‘ছাদ’ নেই না কি ঘরে ‘তণ্ডুল’ নেই? তাহলে কি একটা ‘চাল’ আর অন্যটা ‘চাল্’ লিখতে হবে? এছাড়াও ‘চাল’ শব্দে আচরণ বা দানও বোঝায় (দাবার চাল)। ক্রিয়াপদ হিসেবেও কিন্তু ‘চাল’ শব্দের ব্যবহার আছে।
আর নিম্নলিখিত ক্ষেত্রেই বা আমরা বিভ্রান্তি এড়াতে কী করব?
১. তুই বল
২. তুমি বল
৩. আমার শরীরে বল নেই
৪. বল খেলতে হলে মাঠে যাও
অথবা
১. তুই কর
২. তুমি কর
৩. সময়মতো কর দাও
৪. করমর্দন কর
এই রকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। তাই আমার মতে শুধু হল আর হত শব্দে ও-কার লাগানোর নিয়মের আদৌ কোনও প্রয়োজন নেই।“
বাংলার গবেষক সুমন চন্দ্র দাস এই মতকে সমর্থন করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের মতে, “আমি স্বপনবাবুর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। অভিন্ন বানানের কারণে বাংলা ভাষায় অর্থ বিভ্রাটের সম্ভাবনা বহু ক্ষেত্রে হতে পারে। কিন্তু হয় না। পুরো বাক্য পড়ে বা পুরো অনুচ্ছেদ পড়ে অর্থ ধরতে হয়। সুতরাং অর্থ বিভ্রাট হতে পারে, এই ভেবে ‘হলো’ বা ‘হতো’ লেখার যুক্তি নেই।“

প্রাক্তন উপাচার্য তথা বাংলার অভিজ্ঞ অধ্যাপক ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাস প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, “বাংলা ভাষার নিজস্ব উচ্চারণ-বিধি আছে। বিদেশিদের পক্ষে অসুবিধাজনক। কলকাতা যে ‘কোল্ কাতা’ তা লিখে দেখাবার দরকার পড়ে না। শব্দের সূচনায় আমরা কখনো কখনো ‘অর্ধ বিবৃত অ-ধ্বনি (ইংরেজি got-র o-এর মত)’ উচ্চারণ করি।
অধিকাংশ মধ্যবর্তী ও শেষের অ-স্বরের শব্দে আমরা হলান্ত উচ্চারণ করি। এগুলোতে হসন্ত দিতে গেলে আঙুলে ব্যথা হবে!
‘বেলা যে পড়ে এল জলকে চল’-এর শেষের ল দুটিতে হসন্ত না দিলেও বাঙালি ভুল করবে না। তবু কিছু শব্দে দু’ধরনের বানান চলছে। এগুলো নিয়ে বিস্তৃত অনুপুঙ্ক্ষ আলোচনা চাই।“
***

