হোমের কিশোরীদের উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দিলীপ মহন্তকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিল বালুরঘাট আদালত

পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ৯ মার্চ: হোমের আবাসিক কিশোরীর উপর যৌন নির্যাতন চালানোর ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত দিলীপ মহন্তকে যাব্বজীবন কারাদন্ডের নির্দেশ দিল বালুরঘাট জেলা আদালত। পাশাপাশি তিন লক্ষ টাকা জরিমানাও ধার্য করেছে বালুরঘাট জেলা আদালতের সেকেন্ড এন্ড পক্সো কোর্টের বিচারক সুজাতা খরগো। অনাদায়ে আরো দুই বছর কারাবাসের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। একই সাথে এদিন তিওড় ধীরেন মহন্ত চ্যারিটেবল সোসাইটির হোম কান্ডে দোষী সাব্যস্ত মহিলা সুপার সাবিত্রী হেমব্রম ও অন্য এক মহিলা কর্মী খুশি মন্ডলকে ১০ বছরের কারাদন্ড ও ৩০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। অনাদায়ে আরও একবছর কারাবাস করতে হবে তাদের বলে জানিয়েছেন বালুরঘাট জেলা আদালতের সরকারি আইনজীবী ঋতব্রত চক্রবর্তী। তিনি জানিয়েছেন, হোমের আবাসিক কিশোরীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন সুপার ভক্তি সরকার লাহার অভিযোগের ভিত্তিতেই এদিন দোষীরা সাজা পেয়েছেন।

আদালত সূত্রের খবর, করোনার কারণে গতকাল এই মামলায় ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচারক এই তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। বুধবার তাদের বালুরঘাট জেলা আদালতে সশরীরে আনা হলে বালুরঘাট আদালতের অতিরিক্ত জেলা এবং দায়রা দ্বিতীয় কোর্টের (পক্সো স্পেশাল) বিচারক সুজাতা খারগে এই রায় দেন। ২০১৫ সালে হিলি থানার অন্তর্গত তিওরের ধীরেন মহন্ত চ্যারিটেবিল সোসাইটি হোম কান্ডে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছিল জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যেও। হোমের কর্ণধার দিলীপ মহন্তর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল অসহায়, অনাথ কিশোরী মেয়েদের রোজ তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন চালাবার। ঘটনার জেরে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত দিলীপ মহন্তের বালুরঘাটের বাড়িতেও হামলা চালিয়েছিল সে সময়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। পেশায় এল আইসি’র এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন দিলীপ। কিন্তু চালচলন ছিল যুবরাজের মত বলেও অভিযোগ ওঠে। তার স্ত্রী- কন্যা দিল্লিতে থাকার সুবাদে হোমের মেয়েদের বাড়িতে নিয়ে এসে এই সব অপকর্ম চালাতো সে বলেও অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন ওই হোমের সুপার ভক্তি সরকার লাহা। যে সময় হোমের ৬ নির্যাতিতা কিশোরী মেয়েকে নিয়ে হিলি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তে নেমে দিলীপ মহন্তের বাড়ি থেকে বিদেশী নামি দামি মদের বোতল সহ ৪৫ রকম জিনিস বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। তার ব্যবহারের কম্পিউটার, সিসিটিভি সহ একধিক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস থেকে বেশকিছু তথ্য সামনে আসে। এদিন সেই ঘটনার রায় শুনিয়েছেন বিচারক। যা জানতেই খুশিতে উৎফুল্ল হয় নির্যাতিতা ছাত্রীদের পাশাপাশি ঘটনার মূল অভিযোগকারী ভক্তি সরকার লাহা।

যদিও সাজা প্রাপ্ত খুশি মন্ডলের মা এই রায়ে খুশি নন। তার বক্তব্য তার মেয়ে নির্দোষ। সে তো অনেক আগেই কাজ ছেড়ে চলে এসেছিল। পুলিশ অনেক পরে তাকে ধরে নিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে। মেয়ের মুক্তির জন্য শেষ চেষ্টা তিনি করবেন।

এদিন রায় শোনার পর অভিযোগকারিণী ভক্তি সরকার লাহা আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, আর কোনো আবাসিক মেয়েদের সাথে যাতে এরকম দুষ্কর্ম করার সাহস কেউ না পায়। যদিও এই অভিযোগ করার পর থেকে তাকে নানাভাবে হেনস্থার পাশাপাশি প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার প্রাণ নাশের চেষ্টাও চালিয়েছে দুষ্কৃতিরা।

বালুরঘাট জেলা আদালতের সরকারি আইনজীবী ঋতব্রত চক্রবর্তী বলেন, ২০১৫ সালে তিওড়ের একটি হোমের মামলায় কর্ণধার দিলীপ মহন্তকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের নির্দেশ দিয়েছে। হোমের ৬ আবাসিক ও মূল অভিযোগকারী ভক্তি সরকার লাহার অভিযোগের ভিত্তিতে হোমের সুপার সহ এক মহিলাকে ১০ বছর কারাদন্ডের নির্দেশ দিয়েছে বিচারক। একইসাথে আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছে তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *