জয়দেব লাহা, দুর্গাপুর, ২৫ মার্চ: জেলায় লোকসভার উপনির্বাচন। নির্বাচনে ব্যস্ত সরকারি আধিকারিকরা। আর সেই সুযোগে অজয় ও দামোদরে অবাধে চলছে অবৈধ বালি পাচারের রমরমা কারবার। গ্রিন ট্রাইবুনালে নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নদী গর্ভে চলছে মেশিন দিয়ে বালি ছাকনির কাজ। অন্ধকার নামতেই ওইসব বালি লরি ডাম্পার বোঝাই হয়ে পাচার হচ্ছে শহরে। লোকসান হচ্ছে সরকারের রাজস্ব। বালি বোঝাই বেপরোয়া লরি, ডাম্পার, ট্রাক্টরের যাতায়াতে ভাঙ্গছে গ্রামের রাস্তা। দুর্ঘটনার শঙ্কায় গ্রামবাসীরা। এমনই নজিরবীহিন ছবি ধরা পড়ল অজয় নদের বনকাটি পেয়ারাবাগানন ঘাট ও দামোদর নদের কাঁকসার সিলামপুরঘাটে।
রাজ্যে তৃতীয়বার তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ বালি, পাথর বোঝাই যান চলাচল বন্ধে উদ্যোগী হয় রাজ্য সরকার। সড়কের ওপর বিভিন্ন জায়গায় শুরু কড়া নাকা চেকিং। শুরু হয় ধরপাকড়। এমনকি নদী তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ বালি মজুতের ক্ষেত্রেও ধরপাকড় শুরু হয়। মাস কয়েক আগে কাঁকসা, অন্ডাল, লাউদোহা ব্লকে বেশ কয়েকজন অসাধু বালি কারিবারি ধরাও পড়ে। সম্প্রতি পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল লোকসভার উপনির্বাচন। ওই নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত সরকারি আধিকারিক ও পুলিশ প্রশাসন। আর সেই সুযোগে অজয় ও দামোদর নদে নতুন করে বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। দামোদর ও অজয় নদের বিভিন্ন ঘাটে পাম্প মেশিন বসানো হয়েছে। গত সপ্তাহখানেক ধরে শুরু হয়েছে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন ও বালি পাচার। অজয় নদের পেয়ারাবাগান ঘাটে চলছে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন। দশ চাকা থেকে ১৬ চাকার লরি ডাম্পার বালি বোঝাই হয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে অবাধে যাতায়াত করছে। আর তার ফলে গ্রামের কংক্রিটের রাস্তার ভেঙ্গে পড়ছে।
যাতায়াতের সমস্যায় পড়ছে সাধারন মানুষ থেকে স্কুল পড়ুয়ারা। প্রশ্ন, গ্রামের রাস্তায় কিভাবে ওভারলোডিং ভারি গাড়ি যাতায়াত করে? এছাড়াও জানা গেছে, ওই অবৈধ ঘাটে বালির চালানও দেওয়া হচ্ছে। তবে সেই চালান অন্য বালিঘাটের। ওই ঘাটের বালি কারবারি বছর কয়েক আগে জাল চালানের দায়ে ধরাও পড়েছিল। উদ্ধার হয়েছিল প্রচুর জাল চালান।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে তাদের চালানের বৈধতা নিয়ে। এছাড়াও গ্রিন ট্রাইবুনালের কড়া নির্দেশিকা রয়েছে নদী গর্ভে কোনওভাবে মেশিন বসিয়ে বালি উত্তোলন করা যাবে না। কিন্তু ওই নির্দেশিকাকে কার্যত উপেক্ষা করে মেশিন বসিয়ে অবাধে চলে বালি উত্তোলন চলছে অজয় নদীর ওপর বিভিন্নঘাটে। নদীঘাটে আদায় হচ্ছে টোল। আবার এগারো মাইল মোড়ে ওঠার আগে ওভারলোডিং বালি কাটিং হয় জঙ্গলের রাস্তার পাশে। আর ওই কাটিং বালি ট্রাক্টরে করে বিক্রি করে অবৈধ বালি কারবারিরা।
একইরকমভাবে দামোদর নদের ওপর কাঁকসার সিলামপুর ঘাটে চলছে বালি উত্তোলন। নদী গর্ভে বিশেষ নৌকায় থাকা পাম্প বসানো হয়েছে। রাখা হয়েছে বিশেষ ছাকনি। দিনভর নদীতে পাম্প বসিয়ে জলমিশ্রিত বালি তোলা হয়। জলবালির মিশ্রন বিশেষ ছাকনির সাহায্যে বালি আলাদা করা হয় নদীতে। তারপর ওইসব বালি পানাগড়, সিলামপুর রোডের পাশে ও ক্যানেলপাড়ে মজুত করা হয়। আবার সেখান থেকে জেসিবি দিয়ে ডাম্পার ও লরিতে ভর্তি করে পাচার হয় শহরে। বেপরওয়া ট্রাক্টর যাতায়াতে আতঙ্কিত সিলামপুর সহ আশপাশের বাসিন্দা। কারন রাস্তার ওপরই রয়েছে স্কুল। পড়ুয়াদের ওই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাতায়াত। আর তাতেই দুর্ঘটনার আতঙ্কে পড়ুয়াদের পরিবারের লোকজন।
আবার দামোদর নদীর অন্ডালে মদনপুরে বৈধঘাটের পাশে অবাধে চলছে অবৈধঘাট। আর পাম্প বসিয়ে বালি তোলার ফলে নদীতে অচিরে খাদ তৈরী হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। শঙ্কা বাড়ছে দুর্ঘটনার ও নদী ভাঙনের। দুর্ঘটনাও ঘটে। তবে নজরদারি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। পশ্চিম বর্ধমান জেলা পরিষদের সহ সভাধিপতি সমীর বিশ্বাস জানান, “অবৈধ বালি পাচার কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যাবে না। অবৈধ বালি পাচারে সরকারের রাজস্ব লোকসান হয়। তাই সরকারি নিয়ম মেনে বালি তোলা উচিত। বালি পাচার বন্ধে পুলিশ ও ভুমি রাজস্ব দফতরকে আরও সক্রিয় হতে বলা হবে।” পশ্চিম বর্ধমান জেলাশাসক অরুন প্রসাদ জানান, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”

