সাথী দাস, পুরুলিয়া, ১৬ জুন: পরম্পরা ও ঐতিহ্য মেনে অরণ্য ষষ্ঠী পালন হয়ে গেল পুরুলিয়ায়। দুই বাংলার জামাইরা চব্য-লস্য-লেজ্য-পেয় তে আপ্যায়িত হচ্ছেন ঠিক সেই আঙ্গিকে অরণ্যে বেষ্টিত জেলা পুরুলিয়ায় জামাই আদর পাচ্ছে বট-অশ্বথ প্রভৃতি বৃক্ষেরা। পুরুলিয়ার মানুষের বিশ্বাস গাছই রক্ষা কর্তা। প্রাণের বিকাশ ও সঞ্চারে গাছের ভূমিকা অপরিসীম।তাই, প্রাচীন এই রীতি মেনে উদযাপিত হল অরণ্য ষষ্ঠী ওরফে জামাই ষষ্ঠী। তবে, সবটাই হল কোভিড বিধি মেনে।
কাঁকর মাটির জেলা পুরুলিয়া জঙ্গল বেষ্টিত শাল-সেগুন-পলাশ-মহুয়া-অর্জুন-নিমের জেলা পুরুলিয়াতে মর্যাদা রয়েছে আম-জাম-কাঁঠাল এবং বট-অশ্বথেরও। মানুষের সুখ-দু:খের সাক্ষী বট-অশ্বথও। অরণ্যের সঙ্গে যেমন মিলে যায় জীবন, তেমনই অরণ্য থেকে উঠে আসে লৌকিক উপকরণ। তাই, অরণ্যের আম-জাম-লিচু-কলা দিয়েই জামাইকে বরণ করা হয়। পুরুলিয়াবাসীর বিশ্বাস জামাই ষষ্ঠীতে জামাইদের সমান মর্যাদা দিয়ে পুজো দিয়ে ভোগ নিবেদন করা উচিত্। কারণ, অরণ্য এখানকার রুজি-রোজগার, ক্লান্তিও দূর করে। মনে আনে প্রশান্তি। এছাড়া নানান সামাজিক সংস্কারের সাক্ষী এরা। তাই, জামাই ষষ্ঠী অরণ্য ষষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়েছে এখানে।

করোনা আবহ আর বৃষ্টি উপেক্ষা করে আজ সকাল থেকেই মহিলারা সব রকম নৈবিদ্য ও পুজোর উপাদান সাজিয়ে হাজির হয়েছিলেন বৃক্ষের গোড়ায়। ঝালদার ব্রতী মিররানী সূত্রধর, বুলু মুখার্জি বললেন,‘সংসারের মঙ্গল কামনায় ফি বছর এই পুজো দিই। আমরা আজকের দিনটিকে অরণ্য ষষ্ঠী বলি। অন্যান্য ব্রতীদের কথায়, “পূর্ব পুরুষদের করে আসা এই পুজো আজও আমাদের কাছে তাত্পর্য রয়েছে। অরণ্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে বিশেষ এই দিনে পুজো হয়ে আসছে।” এদিন সকল থেকেই ব্রতীদের আচার-নিয়মের বেড়া জালে আবদ্ধ করে রাখলেন পুরোহিতরা। শতাব্দী প্রাচীন এই রীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পুরোহিত পুরোহিত শম্ভু আচার্য্য জানালেন, “একদিকে যখন অরণ্য ধ্বংস হচ্ছে। অবাধে চলছে বৃক্ষ নিধন সেই সময়ই এক শ্রেণির মানুষ এই সভ্যতায় থেকে বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে সচেতন হয়ে পুজো করে চলেছেন। হয়তো বৃক্ষ তথা অরণ্যকে বাঁচিয়ে রাখতেই অরণ্য ষষ্ঠীর সূচনা হয়েছিল। আজও নিষ্ঠার সঙ্গেই পুজো করালেন ব্রতীরা।”
কাঠ মাফিয়া আর এক শ্রেণির মানুষের অসামাজিক কার্যকলাপ ধ্বংস করছে অরণ্য। অবাধে চলছে বৃক্ষ হত্যা। বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হওয়ার মুখে। ঠিক সেই সময়ই অরণ্য ষষ্ঠী পালনের রীতি ও ধারা মানবকুলকে সৃষ্টির দিকে নিয়ে যাবে বৈকি। এই পরম্পরা আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন লোক গবেষকরা।


