ঝরে গেল আরও একটি প্রাণ, সঙ্কটে গ্রাম বাংলার শ্রমিকরা, লাভপুরে শুধুই হাহাকার

আশিস মণ্ডল, বোলপুর, ৪ সেপ্টেম্বর: সংসারের হাঁড়ি চাপাতে নিয়েছিলেন ঋণ। ভেবেছিলেন দিনকয়েক কাজের পর যে মজুরি মিলবে তা দিয়ে শুধবেন সেই ঋণ। কিন্তু রোজগারের তাগিদে বিভূইয়ে গিয়ে সেই ধার বকেয়া রেখেই দূর্ঘটনার কবলে পড়ে চিরঘুমে চলে গেলেন বছর একুশের পরিযায়ী শ্রমিক। ঋণ মিটল না, বছর দুয়েকের ছেলের আর বাবার মুখ দেখা হল না, বাবাও দেখতে পেলেন না মাস তিনেক পর ভূমিষ্ট হতে চলা অপর সন্তানের মুখ। চেন্নাইয়ে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চিরবিদায় নিলেন হতদরিদ্র মজদুর রঞ্জু দাস।

লাভপুরের চৌহাট্টার রথতলা। সেখানেই প্রায় ধ্বসে যাওয়া দেওয়াল, আগাছায় ঢাকা পচা খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরের বাস করা এক হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র ছেলে রঞ্জু দাস। গাছ থেকে পড়ে বছর কয়েক আগে খোঁড়া হয়েছেন বাবা উত্তম দাস, প্রায় শয্যাশায়ী। ঘরে মা, স্ত্রী, এক ছেলে। স্ত্রী আবার অন্ত:সত্বা। রঙের হেল্পারের কাজ করতেন রঞ্জু। কিন্তু কাজের আকালের রোজগার তলানিতে চলে যাওয়া থেকে রেহাই পাননি রঞ্জুও। অগত্যা উপায় না পেয়ে পাঁচ জনের পেটের ভাত জোগাড় করতে চারশো টাকার মজুরিতে রাজমিস্ত্রির জোগারের কাজ জুটিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন চেন্নাইয়ের ভরতনগরে। সেই কাজ করতে গিয়েই বুধবার বিকেলে কাজ শেষ করার মুহূর্তে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছিটকে পড়েন রঞ্জু। ঘটনাস্থলেই বেরিয়ে যায় প্রাণ। শনিবার সকালে রঞ্জুর দেহ এসে পৌছায় গ্রামে।

গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ে রঞ্জুর বাড়িতে। কান্নার রোলে ঢাকা পড়ে বাকি সব শব্দ। রঞ্জু দাসের কাকা জয়েদেব দাসের কথায়, ‘‘কাজকাম কিছুই মিলছিল না এখানে, তাই বাধ্য হয়ে এই সবে ভাদ্র মাসের পয়লা তারিখে ভাইপো যায় চেন্নাই। গত বুধবার বিকেলে খবর আসে সে আর নেই। সংসার চালানোর জন্য দুটো রোজগার করতে গিয়ে অকালে হারাতে হল ছেলেটাকে। পরিবারটা পথে বসল। এভাবে আর যে কত প্রাণ যাবে কে জানে। বাড়িতে পয়সা ছিল না। রঞ্জু কাজে গিয়েই বন্ধুবান্ধবদের কাছে ধার করে দু হাজার টাকা পাঠিয়েছিল সংসার খরচের জন্য। ভেবেছিল কাজ করার পর মজুরি থেকে শোধ করবে। মাস তিনেক পরেই আবার বাচ্চা হবে রঞ্জুর স্ত্রী।’’

গ্রামের মানুষ জানিয়েছেন, গত দু বছরে এই এলাকারই আরও তিনজনের প্রাণ গিয়েছে, এমনভাবেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। যেমন পাশের পাড়া হিরাপুরের সেখ ইসমাইল, গাজিপাড়ার সেখ রওসন ও সেখপাড়ার সেখ গোলাপ, কেউ মাচা থেকে পড়ে, কেউ তিনতলার ছাদ থেকে পড়ে অকালেই চিরবিদায় নিয়েছেন।

কাজের আকাল, গ্রামপথে সঙ্কটের জেরবার বাংলার শ্রমিকদের বিদেশবিভূয়ে গিয়ে অকালে মৃত্যুর তালিকা ক্রমশই লম্বা হচ্ছে এ বাংলায়। তাতে শুধু বীরভূমেরই রয়েছে বহু। যেমন জুলাই মাসের প্রথমেই হাওড়ার জয়পুর থানার ধরমপোতা গ্রামে নির্মীয়মান একটি বেসরকারি লজে কাজ করার সময় সেপটিক ট্যাঙ্কের সেন্টারিংয়ের কাঠ খুলতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের থাবা প্রাণ কাড়ে বীরভূমের লোহাপুরের নওয়ারপাড়ার সেখ জাকির (৩৪), সেখ তুফান (২৫) ও সাবির সেখের(৩৩)। এই ব্লকেরই কালিপাড়ার শ্রমিক ইয়ার মহম্মদ গত মে মাসে লকডাউনে কাজ হারিয়ে হায়দ্রাবাদ থেকে দিনের পর দিন অভূক্ত শরীরে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে ফেরার ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে ওড়িশার সোরোতে এক বারান্দার উপরই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন গরিব নির্মাণ শ্রমিক। আবার গত ২৩জুন চেন্নাইয়ে কাজ করতে করতে চারতলা থেকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুবরাজপুরের গুনডোবা বাউড়ি পাড়ার নির্মান শ্রমিক মাত্র উনিশ বছরের মলয় বাউরি। অকালে স্বামীকে হারিয়েছে তাঁর অন্ত:সত্বা স্ত্রী। গত ২জুন মুম্বাইয়ে মেশিনে মার্বেল কাটতে গিয়ে ইলেকট্রিক শক লেগে মৃত্যু হয়েছে রামপুরহাটের শাসপুর গ্রামের সাইদুল সেখের। এই তালিকায় রয়েছে এমনই আরও অনেক নাম। তালিকা দীর্ঘ। কারন এই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য রাজ্য সরকারের ‘শুনতে ভালো ঘোষনা’র সুফল পাওয়ার তালিকা যে একেবারেই ক্ষুদ্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *