প্রতীতি ঘোষ, আমাদের ভারত, ব্যারাকপুর, ১১ অক্টোবর: আকাশে পেঁজা তুলো জানান দিচ্ছে মা উমা এসেছেন মর্তে। ঢাকে কাঠি পরতেই বারোয়ারি পুজোগুলির পাশাপাশি শুরু হয়ে গিয়েছে বনেদি বাড়ির পুজোও। ২১৩ বছরের পুরনো ইছাপুরের নবাবগঞ্জের মন্ডল বাড়ির পুজোও শুরু হয়েছে সমস্ত নিয়ম মেনে। তবে আজও সবেকিয়ানা বজায় রয়েছে এই পুজোর। এখানে মা দুর্গা শুধু নন শিব ও গৌরী একসাথে তাদের
সন্তানদের নিয়ে পূজিত হন পুজোর দিনগুলিতে।
করোনা পরিস্থিতিতেও এত টুকু ভাটা পড়েনি এই পুজোয়। পুজো শুরু হতেই আত্মীয়রা আসতে শুরু করেছেন দেশ বিদেশ থেকে।
এই বাড়ির ইতিহাস প্রায় সাড়ে চারশো বছরের, তখন নবাবগঞ্জের নাম ছিল বাকে বাজার। মন্ডলরা মূলত কৃষি ও বণিক পরিবার, সাড়ে চারশো বছর আগে এই মন্ডল পরিবারের এক সদস্য রাজ গোপাল মন্ডল শুরু করেন ধান্য লক্ষ্মীপুজো। এরপর বহুদিন গড়িয়েছে, ধীরে ধীরে পরিবার হয়েছে বড়। ২১৩ বছর আগে ধান্যলক্ষ্মী রূপ নেয় দুর্গা পুজোয়। যদিও ধান্যলক্ষ্মীর পুজো বন্ধ হয়নি কোনও দিন আজও বছরে চার বার পুজো হয়। এই বংশের বংশধর রসময় মন্ডল দুর্গাপুজো শুরু করেন। তবে প্রথম ১৭ বছর মূর্তি ছাড়াই দুর্গা প্রতিমার পুজো হয় এর পর আসে দুর্গা মূর্তি। মন্ডলরা মূলত ছিলেন বৈষ্ণব তাই বৈষ্ণব মতে হয় পুজো এবং তা আজও চলে আসছে।
শ্রীধর মন্ডল, বংশীধর মন্ডল তারা পুরোপুরি ভাবে শুরু করেন নুন এবং মশলার ব্যবসা। সেই সময় থেকেই মন্ডলদের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে, আরও ধুমধাম করে শুরু হয় দুর্গাপুজো। মন্ডল বাড়ির ঠিক পাশেই বয়ে চলেছে গঙ্গা, আর এই নদী পথ ধরেই তারা যাতায়াত করতেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাড়ির পাশেই তারা তৈরি করেন একটি ঘাট, আজও মন্ডল ঘাট নামে খ্যাত মূলত হরগৌরীর পুজো হয় এই মন্ডল বাড়িতে। যে স্থানে পুজো হয় সেই স্থানে রয়েছে মায়ের ভোগ রান্নার জায়গা, পুজোর সামগ্রী রাখার ঘর, ভোগ খাওয়ানোর জায়গা। এই ঠাকুর রাড়িতে বসবাস করেন না মন্ডল পরিবার, সেটি শুধু ঠাকুরদালান। এখানে মায়ের মূর্তির পিছনে যে চালচিত্রটি দেখা যায় তা প্রথম থেকেই ওই একই ভাবে আঁকা হয় আকেঁন মন্ডল পরিবারের সদস্যরাই আর সেই প্রথা আজও চলে আসছে। দুর্গাপুজোর সময় দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমস্ত আত্মীয়-স্বজনরা আসেন মন্ডল বাড়িতে, কিন্তু করোনার জন্য গতবছর কেউই আসতে পারেননি। এ বছরও হয়তো অনেকের আসা হবে না, কিন্তু বর্তমানে যারা এই মন্ডল বাড়িতে থাকেন তারাই পুজো করেন। আজও পুজো মানেই ঠাকুর দালানে ছোটদের হৈ চৈ, পরিবারের সবার একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া।

এই পুজোর একটি ট্রাস্টি বোর্ড রয়েছে তাই বর্তমানে মন্ডল পরিবারের কোনও সদস্যকে কোনও টাকা পয়সা দিতে হয় না। ছোটরাও এই কটাদিন মেতে থাকেন পুজোর আনন্দে। রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজো হয় এরপর থেকেই শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ আর বাড়ির সদস্যরা পালা করে তার তদারকি করেন। আর দেবীর বিসর্জনও হয় প্ৰথা মেনে। এই মণ্ডল বাড়ির ঠাকুর সবার আগে বিসর্জন হয়। বাড়ির সদস্যরা নিজেরাই ঘাড়ে করে স্বপরিবার দুর্গা ঠাকুরকে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে নৌকার মাধ্যমে মাঝ গঙ্গায় বিসর্জন দেন।
এই পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, আমরা সমস্ত করোনা বিধি মেনে পুজো করব। তবে বাইরের লোকদের এবার আর ঠাকুর দালানে আসতে বাধা দেওয়া হবে না। কারণ এখানে অনেক দূরের মানুষরাও আসেন ঠাকুর দেখতে, পুজো দিতে। তবে এবার সকলকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। তবে দর্শকদের মানতে হবে কোভিড বিধি।”

