জোড়া নিম্নচাপের জেরে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি, জলমগ্ন পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তৃর্ণ এলাকা

কুমারেশ রায়, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৫ সেপ্টেম্বর:
বঙ্গে বর্ষার সমস্ত রেকর্ড বোধহয় ২০২১ এ ভাঙতে চলেছে। বিশেষত, দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে এত দীর্ঘমেয়াদি এবং শক্তিশালী বর্ষা হয়তো বিগত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। আগস্ট মাসের মধ্যেই দু’-দু’বার প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের কারণে, মধ্য সেপ্টেম্বরে ফের একবার প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দুই মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এবং অপেক্ষাকৃত নীচু এলাকাগুলিতে।

সোমবার থেকে যে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে, বুধবার ভোররাত থেকে তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বজ্র-বিদ্যুৎ সহ আকাশভাঙা বৃষ্টি হচ্ছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জেলা শহর মেদিনীপুর, খড়্গপুর, বেলদা, নারায়ণগড়, সবং, ডেবরা, কেশপুর, গড়বেতা থেকে শুরু করে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তির্ণ এলাকা। আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বুধবার সকাল থেকেই দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ কমার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, নিম্নচাপ ছত্তিশগড়ের উত্তর উপকূলে সরে যাওয়ার কারণে। তবে, বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১২ টা থেকে ভোর ৪ টা পর্যন্ত যেভাবে বৃষ্টির বহর বেড়েই চলেছে জেলাজুড়ে তাতে দুর্যোগ কমা তো দূরের কথা, ফের একবার দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের আকাশজুড়ে।

ইতিমধ্যে, মঙ্গলবার সন্ধে ৭ টা পর্যন্ত গত ১৯ ঘন্টায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগের তরফে জানানো হয়েছে। যা আগের বারের তুলনায় দ্বিগুণ। তবে, মঙ্গলবার সন্ধে ৭ টা থেকে বুধবার ভোর ৪ টে পর্যন্ত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাজুড়ে যে প্রবল বর্ষণ হয়েছে, তাতে ৯ ঘন্টাতেই বৃষ্টির পরিমাণ ৬০-৭০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গিয়েছে।

এদিকে, প্রবল বর্ষণে জেলাজুড়ে কয়েক হাজার বিঘা কৃষি জমি ইতিমধ্যে জলের তলায় চলে গেছে। আমন ধানের চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। এছাড়া, সবজি চাষেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সমগ্র ঘাটাল মহকুমা এবং খড়্গপুর মহকুমার ডেবরা, সবং, পিংলা, বেলদা, নারায়ণগড়, দাঁতন, মোহনপুর প্রভৃতি এলাকায় কৃষিজমি, মাটির ঘরবাড়ি, অস্থায়ী সেতু এবং রাস্তাঘাট বিপর্যস্ত। মেদিনীপুর সদর মহকুমার মেদিনীপুর, গড়বেতা প্রভৃতি এলাকারও বিস্তীর্ণ অংশ ইতিমধ্যে জলমগ্ন হয়েছে। জল বাড়ছে কংসাবতী ও শিলাবতী নদীতে। জল ছাড়া হয়েছে ঝাড়খণ্ডের গালুডি বাঁধ থেকেও। সব মিলিয়ে বৃষ্টি থেমে গেলেও, আগামী কয়েকদিনে জেলার একাধিক এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানাগেছে জেলা প্রশাসন সূত্রে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো ফের আগামী শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর) থেকে আরও একটি নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে আবহাওয়া দপ্তরের একদল বিশেষজ্ঞ।

এদিকে, গত দু’দিনের টানা বৃষ্টির জেরে ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করেছে কেলেঘাই নদীর জল। এর জেরে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং ব্লকের সারতা অঞ্চলের রামপুরা এলাকার কুলেশ্বরী খাল সংলগ্ন নদী বাঁধে ধ্বস দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, সবংয়ের বেশ কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জলের তলায় চলে গেছে কয়েকশো বিঘা কৃষি জমি। তার সাথে বেশ কিছু রাস্তায় ধ্বস নেমেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে, সবং বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক তথা রাজ্যের জলসম্পদ মন্ত্রী মানস রঞ্জন ভুঁইঞা প্রতিটি অঞ্চলের পঞ্চায়েত-প্রধান সহ এলাকার মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। পাশাপাশি তিনি জেলাশাসক ডঃ রশ্মি কমলকে পুরো বিষয়টি জানিয়েছেন। যেসব এলাকায় নদী বাঁধে ধ্বস নেমেছে সেগুলি দ্রুত মেরামতির জন্য জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ঘাটাল ও খড়্গপুর মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অস্থায়ী সেতু ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়ে বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *