এনআইআরএফ তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের ‘সাফল্য’, আসল সত্য কি সামনে আসছে?

ডঃ বাসব চৌধুরী
আমাদের ভারত, ১৮ জুলাই:
পরীক্ষায় প্রথম হবার তাড়নায় কত প্রতিভা নষ্ট হয়েছে! রাঙ্কিং এর rave রিভিউ পাবার জন্য কত প্রতিষ্ঠানকে যে কত অসত্যভাষণ করতে হচ্ছে, কেউ কি তা তলিয়ে ভাবে? কেউ কি খবর রাখে? হয়তো জানে সবাই।

প্রথম হলে প্রথা হল অভিনন্দন জানানো। কাগজ জুড়ে খবর হচ্ছে। বেশ খুশি খুশি ভাবও হচ্ছে। কিন্তু আসল সত্য কি সামনে আসছে? জানি না। এ সব নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করাও অসুবিধেজনক। বিখ্যাত অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ভারতবর্ষ গুরুবাদের দেশ। এখানে সমালোচনা চলে না। অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের লেখায় এই তথ্য পেয়েছি। প্রথম দ্বিতীয় ইত্যাদির সার্টিফিকেট বড় ভারি। সেই ভার বয়ে বেড়াবার তাগিদে মানুষকে সারা জীবন ধরে অসত্য বলে যেতে হয়।

আবার পঞ্চাশ শতাংশ নম্বর না পাওয়া লোক উচ্চ আসনে বসলেও অনেক মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। এ সব হল পাবলিকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার জন্য ক্রমাগত ট্যাক্স দিয়ে চলা। এতে আর কিছু হোক বা না হোক, মনুষ্যচরিত্র নষ্ট হয়। তবে সুবিধাবাদী সুধীজন আর চরিত্র নিয়ে ভাবেন না, বরং চামড়া পুরু হলে পুরুষোত্তমের তকমা জুটতে পারে এ যুগে, এ কালে।

এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙে ভরা – ঈশ্বর গুপ্ত কবেই লিখে গেছেন। রাঙ্কিং এর মহারঙ্গে বছর বছর হাজির হওয়া এখন কর্তব্য। তারপর সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে মুচকি হাসি সহ ছবি কাগজে ছাপা হলে বুকের ছাতি খানিক ফোলে বৈকি! কয়েকজন কয়েক কোটির চাকরি পেল, কবে সত্যেন বোস ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন, সেই সব নিয়ে বেশ চলছে তো। ওদিকে ডোম পদে চাকরি পেতে পি এইচ ডি-রা লাইন দেয়।

এ কথা লিখলে বলা হবে, এরা নিন্দুক। এরা শত্রুপক্ষ। ওদিকে চাকরি পাবার কেলেঙ্কারি। তবু মস্ত মস্ত শরীর নিয়ে পালোয়ানরা দিব্যি দাঁড়ায় মঞ্চে। লজ্জা আছে! লজ্জা থাকলে হয় কখনো! ওসব মধ্যচিত্তরা থাকুক পড়ে পেছনে। আমি তো বেশ আছি মধুবনে। দাদা, দিদি, কাকু, জেঠু যদ্দিন আছে, থাকবে সব। থাকবে আর রাঙ্কিং করবে। ভিক্টরি স্ট্যান্ডে দাঁড়াবে।

ছাত্র ছাত্রীরা কী বলে এই সব নিয়ে? তারা কি জানে এ সবের মানে কী? তাদের কি বোঝানো হয়েছে? আগের বছর প্রথম দ্বিতীয় হবার ফল কি ছাত্রদের জীবনে অধিকতর আশীর্বাদ নিয়ে আসছে? বেকারি কমছে? শিক্ষার মান বাড়ছে? ছাত্ররা কি নিজেদের বেশি কনফিডেন্ট, বেশি empowered ভাবছে? তারা টাকাপয়সা দিয়ে চাকরি অর্জন করবে না তো? তারা human values এ দীক্ষিত হবে তো? না কি তাদের মেন্টরদের মতন মুখে রবীন্দ্র, অরবিন্দ, আর কাজে পাড়ার তিনকড়ি শ্যামলা? জানতে ইচ্ছে করে।

রাঙ্কিং! বুকে হাত দিয়ে ভাবুন না ঠিক কোথায় আছি আমরা। সঠিক উত্তর পাওয়ার নাম শিক্ষা। তেমন শিক্ষা, তেমন উপলব্ধি নিঃসঙ্কোচে বলতে পারার সাহসের নামও শিক্ষা। ছাত্রছাত্রীরা ভেবে দেখুক সেই শিক্ষা তারা পাচ্ছে কিনা। অন্যথায় এই সব লোক দেখানো হাসি মুখ আর অন্তরে অতৃপ্তি। সততা নিয়ে একটু পিছিয়ে থাকলে ভাল হত না! অবশ্য যার যেমন রুচি।

“উচ্ছে বিচি পটল কচি, শাকের ছা, মাছের মা, কচি পাঁঠা, বৃদ্ধ মেষ, দধির অগ্র, ঘোলের শেষ।” লোক দেখানো তো অনেক হল। এবার নিজের চরকায় তেল দ্যান কত্তা। Rank এ ছাত্রের পেট ভরে না। এ সত্য বুঝবো ক্যামনে?

(লেখক প্রাক্তন উপাচার্য। কিছুকাল প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন নামী বানিজ্যিক সংস্থায়। মুম্বাই থেকে কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি, দি নেদারল্যান্ডস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পোস্ট ডক, ১৯৯১ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্তরের অধ্যাপনায়, সেখানেই রেজিষ্ট্রার। দেশে বিদেশে অসংখ্য শিক্ষাশিবিরে আমন্ত্রিত বক্তা।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *