দক্ষিণ দিনাজপুরে চেয়ারম্যানের দুর্নীতি নিয়ে পোস্টার মারলো খোদ তৃণমূল কর্মীরাই, চক্ষু চড়কগাছ সাধারণের, ঘরোয়া কোন্দল বলল বাম- বিজেপি

পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ১০ নভেম্বর: তৃণমূল নেতার লাগামহীন দুর্নীতি নিয়ে পোস্টার কুমারগঞ্জে। একটি বা দুটি নয়, প্রায় কুড়িটি দুর্নীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন খোদ দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান। বৃহস্পতিবার সকালে জেলা নেতা নিখিল সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে পড়া এমন পোস্টারকে ঘিরে রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ হয় দলীয় নেতা কর্মীদের। তৃণমূল কর্মীদের তরফে লাগানো ওই পোস্টারকে ঘিরে এদিন সকাল থেকে তুমুল চাঞ্চল্য ছড়ায় কুমারগঞ্জের প্রাণসাগর ও গঙ্গারামপুরের ফুলবাড়ি এলাকায়। বিজেপির কারসাজি বলে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব দাবি করলেও, ঘটনার পিছনে যে তৃণমূলের লোকেরাই জড়িত রয়েছে তা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান নিখিল সিংহ রায়। বিজেপি ও সিপিএম অবশ্য এই ঘটনাকে তৃণমূলের ঘরোয়া কোন্দল বলেই ব্যাখ্যা করেছেন।

জানা যায়, এদিন সকালে কুমারগঞ্জের প্রাণসাগর এবং গঙ্গারামপুরের ফুলবাড়ি এলাকায় বেশ কিছু হাতে লেখা পোস্টার দেখতে পান স্থানীয়রা। যে পোস্টারের উপরে লেখা রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা নিখিল সিংহ রায়ের সম্বন্ধে কিছু রাজনৈতিক তথ্য। দু’পাতার ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয় প্রায় কুড়িটি বিভিন্ন দুর্নীতির কাজ। যার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠির শুরুতেই তাকে বাংলাদেশি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয় তার যে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, সেটাও উল্লেখ করা রয়েছে। পোস্টারে আরো উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে এসে বিজেপি নেতার বাড়িতেই থাকতেন তিনি। এরপরেই তুলে ধরা হয়েছে কুমারগঞ্জ ব্লক জুড়ে তার লাগামহীন দুর্নীতির কথা। যার মধ্যে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এই তৃণমূলের চেয়ারম্যান নিখিল সিংহ রায় আগে ভূমিহীন থাকলেও বর্তমানে অবশ্য তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক। ২০০৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কুমারগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতি ও আটটি গ্রাম পঞ্চায়েতের সমস্ত ঠিকাদারি কাজ থেকে নিজে অর্থ কমিশন নেন। স্ত্রীকে এসএস কে স্কুলের শিক্ষিকা থেকে শুরু করে ছেলেকে কলেজে নিয়োগ সবই দুর্নীতি করেই করেছেন ওই তৃণমূল নেতা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। এছাড়া নিজের নামে দুটি ও ভাইয়ের নামে একটি এনজিও খুলে তার চেয়ারে বসে ওই ব্লকের কোটি কোটি টাকার কাজ করছেন। এখানেই শেষ নয়, সিভিক নিয়োগে ৪৫০ জনের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে নিয়েছিলেন ওই তৃণমূল নেতা এমনটাও উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের দেওয়া গাড়ি উপহার ও সীমান্ত এলাকার নানা অবৈধ ব্যবসার কমিশনও তোলেন তিনি পোস্টারে তাও উল্লেখ করেছেন তৃণমূল কর্মীরা। নাম প্রকাশ না করলেও তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী ও হিতাকাঙ্ক্ষীরাই যে সেটা লিখেছেন চিঠির শেষে তাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিন সকালে যা দেখতেই রীতিমতো আঁতকে উঠেছেন অনেকেই। দলের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেই যদি এমন পোস্টার পড়তে থাকে তবে সাধারণ নেতারা কোথায় যাবেন, এই আতঙ্কে ইতিমধ্যে ঘুম উড়েছে একাংশ তৃণমূল নেতাদের। এদিকে খোদ দলের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এমন লাগামহীন দুর্নীতি পোস্টার আকারে উঠে আসতেই কার্যত অস্বস্তিতে পড়েছে ঘাসফুল শিবির। এদিকে রাতের অন্ধকারে কুমারগঞ্জের বিস্তৃর্ণ এলাকায় কে বা কারা পোস্টার মারলো তা নিয়েও বিস্তর জল্পনা ছড়িয়েছে গোটা জেলাতেই। তবে ইতিমধ্যে সিসিটিভির ফুটেজে চার ব্যক্তিকে দেখা গিয়েছে। যারাই রাতের অন্ধকারে পোস্টার মারছিলেন। কিন্তু তারা কোন দলের তা এখনও কেউই শনাক্ত করতে পারেনি।

যদিও এই ঘটনা নিয়ে সরাসরি বিজেপির দিকে আঙুল তুলেছে প্রাণসাগরের এক তৃণমূল নেতা শান্ত ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বিজেপির জেলা সভাপতির বাড়ি এই এলাকাতে। তার অঙ্গুলি হেলনেই এসব হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা অজগর আলী বলেন, এদিন সকালে এলাকার বিভিন্ন দেওয়ালে লাগানো পোস্টার দেখতে ভিড় জমিয়েছিল এলাকার মানুষ। তৃণমূলের জেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লেখা পোস্টারে কি ছিল তিনি সেসব পড়েননি।

জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান নিখিল সিংহ রায় অবশ্য জানিয়েছেন, দলের অনেকেই তাকে ঈর্ষা করে। এই ঘটনা সেসব লোকই ঘটিয়ে থাকতে পারে, আবার বিজেপিও করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন।

সিপিএম নেতা পার্থ সরকার বলেন, নিজেদের মধ্যে ঝামেলার জেরেই এসব। অন্য কেউই এগুলো করবে না।

বিজেপির জেলা সভাপতি স্বরূপ চৌধুরী বলেন, বিজেপি ব্যক্তি আক্রমনে বিশ্বাসী নয়। তৃণমূলের লোকেরাই এসব করে বেড়াচ্ছে। নিজেদের ঘরের কোন্দল এভাবে সামনে বেরিয়ে আসাটা শোভনীয় নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *