দলবদলু, নাকি নেতাদের আচরণ, বাংলায় বিজেপির ভরাডুবির কারণ নিয়ে গোয়েন্দা রিপোর্ট জমা পড়ল শাহের কাছে

আমাদের ভারত, ১মে: মাস খানেকের বেশি সময় কেটে গেছে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে পদ্মশিবিরের। আর এই ভরাডুবির কারণ নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। কিন্তু জানা গেছে, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তরফে এই ভারবুরির কারণ ও বঙ্গ বিজেপির ভবিষ্যত পরিস্থিতি কী হতে পারে তা নিয়ে একটি রিপোর্ট জমা পড়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তথা বিজেপির চানক্য অমিত শাহের কাছে। বলাই বাহুল্য এই রিপোর্ট নিয়ে রীতিমতো শোরগোল শুরু হয়েছে পদ্ম শিবিরে।

প্রশ্ন উঠেছে কি আছে ওই গোয়েন্দা রিপোর্টে? শোনা যাচ্ছে বঙ্গ বিজেপির দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এই নিয়ে ইতিমধ্যেই কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে কোনো বঙ্গ পদ্ম নেতাই মুখ খুলতে চাননি। সূত্রের খবর, ওই রিপোর্টে হারের একাধিক বিস্ফোরক কারণের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে হারের জন্য দায়ী করে একাধিক শীর্ষ নেতার নামের উল্লেখ রয়েছে। ২৮০ পাতার ওই রিপোর্টে উঠে এসেছে দলবদলুদের প্রসঙ্গ।

যারা অন্য দল থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়ে পদ্ম প্রতীকে নির্বাচনের ময়দানে নেমেছিলেন তাদের অধিকাংশকেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে, এমনকি তাদের জনপ্রিয়তাও যথেষ্ট কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সেই জন্যেই মানুষ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছে, যার ফলে ক্ষতি হয়েছে বিজেপির।

গোয়েন্দা রিপোর্টে বেশ কিছু বিজেপি নেতার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে পদ্ম নেতাদের প্রকাশ্যে হুমকি-ধমক- আস্ফালন সংখ্যালঘুরা ভালো ভাবে নেয়নি। ফলে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় পুরোটাই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে চলে গেছে।

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ওই রিপোর্টে” জয় শ্রীরাম” ধ্বনি নিয়েও বলা হয়েছে। বাঙালি হিন্দুরা জয় শ্রীরামের ধ্বনির সাথে নিজেদের কখনোই একাত্ম করতে পারেনি। কারণ বাংলায় তেমন ভাবে ভগবানের রামের পুজোর চল নেই, বরং যে পুজোগুলো বাঙালির উৎসবের অন্যতম যেমন দুর্গোৎসব, কালিপুজো সেগুলি নিয়ে সেভাবে বিজেপি মাথা ঘামায়নি। তবে ধর্মীয় ক্ষেত্র যা বিজেপির অন্যতম ইস্যু সেখানে বাঙালিয়ানায়কে আপন করতে অক্ষম হয়েছে পদ্মশিবির।

ভোটের প্রচার, কৌশল নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে। বলা হয়েছে প্রার্থীরা প্রচারে নির্বাচনী তহবিলের অর্থ ঠিকভাবে খরচ করেননি। কেন্দ্রীয় নেতারা বারবার বাংলায় আসার ফলে গুরুত্ব হারিয়েছেন রাজ্য নেতারা। এটাকে নিচুতলার কর্মীরা ভালোভাবে নেননি। প্রচারে লোক টানতে সেলিব্রিটিদের হাজির করানো হলে সেখানে ভিড় হয়েছে। কিন্তু সেই ভিড়ের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে পাওয়া যায়নি। বাঙলার ভোট প্রচারে অন্যরাজ্যের যে অবাঙালিদের নামানো হয়েছিল তাদের সভায় মানুষ হাজির হলেও ভাষার সমস্যার কারণে তাদের কথাই বুঝতে পারেনি আমজনতা।

এছাড়া জেলা স্তরের নেতাদের একাংশের বিলাসবহুল জীবনযাপন মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। রাজ্যস্তরের ৩০ জন শীর্ষ নেতার জীবনযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে রিপোর্টে। তাতে তৃণমূল থেকে আসা দুই নেতার নামের উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দুই নেতার একজন আবার ভোটের আগেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি বেশকিছু জায়গায় আরএসএস-এর সঙ্গে বিজেপি নেতাদের সরাসরি সংঘাতের কথাও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টে।

রিপোর্টে পরাজয়ের কারণ যেমন বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তেমনি বঙ্গ বিজেপি নিয়ে আশঙ্কার ভবিষ্যতবাণীও রয়েছে। বলা হয়েছে আগামীদিনে দলে ভাঙন হতে পারে। বিজেপি বিধায়কের একাংশ তৃণমূলে যোগ দিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এই বিষয়টি সামনে আসতেই দলের নেতৃত্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। বিজেপি সূত্রের দাবি, একটি অংশ বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের ও অন্যটি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে। অন্য একটি পক্ষ দিলীপ ঘোষকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে। এমনকি প্রার্থী তালিকা তৈরিতেও দিলীপ ঘোষের মতামত নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। রাজ্য নেতৃত্বের একাংশ ভোটে পরাজয়ের দায় কেন্দ্রের ঘাড়েই চাপিয়েছেন।

বিজেপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেছেন দলের পরাজয় নিয়ে আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বার্তা পেয়েছি। তবে বিজেপি এই ফলাফলের পেছনে একটা বা দুটো কারণ থাকতে পারে না। এই হারের জন্য একাধিক কারণ রয়েছে। দল সেই সব বিষয় নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে, যাতে হারের কারণগুলিকে চিহ্নিত করা যায়। আর এর থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে ভুল শুধরে নেওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *