আমাদের ভারত, ২ সেপ্টেম্বর: রাজনৈতিক পালা বদলের পরে বাংলার প্রথম দুর্গা পুজো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে পাশাপাশি নানা মহলে সংশয়ও রয়েছে। সেই সব আশঙ্কাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে বাজিমাত করতে চলেছে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। এবার মহালয়ার দিন কলকাতার ইডেন গার্ডেনে বিরাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করছে নতুন সরকার বলে নবান্ন শীর্ষ সূত্রের খবর।
জানা যাচ্ছে, বাংলার দুর্গা পুজোকে বিশ্বের সামনে আরো বড় পরিসরে তুলে ধরাই হবে এই মেগা শো- এর মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সূত্রের খবর, মহালয়ার ওই অনুষ্ঠানের আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃত দপ্তরের তরফে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য দরপত্র ডাকার প্রক্রিয়াও চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক চললে আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেনে হবে মেগা অনুষ্ঠান।
প্রতিবছর দুর্গাপুজোর শেষে কলকাতায় রেড রোডে পুজো কার্নিভালের আয়োজন করা হতো মমতা সরকারের আমলে। সেখানে শহরে নির্বাচিত পুজো কমিটি গুলি অংশগ্রহণ করত। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলার পুজোকে ঘিরে আরও বড় পরিকল্পনা করছেন বলেই সূত্রের খবর। অনেকেই বলেন, কার্নিভাল ছিল সরকার পোষিত কিছু পুজোকে নিয়ে ভাঙ্গা পুজোর হাট। যা গোটা রাজ্যের মানুষকে স্পর্শ করতো না। কিন্তু এবার নবান্নের পরিকল্পনা মহালয়ার দিন থেকে গোটা রাজ্যে পুজোর আবহকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরা।
পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবী পক্ষের সূচনার দিনটিকে তাই বেছে নেওয়া হয়েছে। মহালয়া বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় তিথি নয়, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী, তর্পণ এবং দেবীর আগমনী বার্তা। সব মিলিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে দিনটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই আবেগকে কেন্দ্র করে ইডেনে আলোকসজ্জা, সঙ্গীত, নৃত্য ও বাংলা লোকসংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি বৃহৎ উপস্থাপনার কথা ভাবা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সূত্রের খবর, বাংলায় দুর্গাপুজোর ইতিহাস দেবীর আগমনী, বিভিন্ন জেলার লোকসংস্কৃতি, ঢাক, ধুনুচি নাচ ও এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারাকে একটি সুবিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশনের মধ্যে আনার পরিকল্পনা চলছে। কেবল কলকাতার শিল্পীরাই নন, রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক শিল্পী ও ঢাকিকে অনুষ্ঠানে যুক্ত করা হতে পারে। একই সঙ্গে কয়েক হাজার শিল্পীর সমবেত পরিবেশনার কথা ভাবা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, আয়োজনের ব্যাপ্তি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে যাতে গোটা দেশের নজর কাড়ে এই অনুষ্ঠানটি। বিভিন্ন ডিজিটাল ও সম্প্রচার মাধ্যমে দেখানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারের অংশ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পালা বদলের পর কলকাতা সহ শহরতলীর বেশ কয়েকটি বড় পুজোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এতদিন পুজো গুলির সঙ্গে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা- মন্ত্রী, কিংবা জনপ্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন। ভোটে পরাজয়ের পর তাদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। ফলে সংশ্লিষ্ট পুজো গুলির বাজেট, থিম আয়োজন আগের মত থাকবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে।
কিন্তু দুর্গাপুজোর আয়োজন ঝিমিয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুজোকে ঘিরে প্রতিমা শিল্পী, আলোক শিল্পী, মন্ডপ নির্মাতা, ঢাকি, পোশাক ব্যবসায়ী, পরিবহন কর্মী, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিজ্ঞাপন, খুচরো বাজার ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। সমীক্ষা তথা বাণিজ্যিক হিসেব বলছে দুর্গাপুজোর সময় বাংলায় সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্র মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। ফলে উৎসবের প্রাণবন্ত চরিত্রকে বজায় রাখতে সরকারকে একটি বড় উদ্যোগ নিতেই হবে।
অন্যদিকে বিরোধী থাকার সময় বিজেপি বারবার অভিযোগ করেছিল মমতা সরকার বাংলার দুর্গাপুজো ও হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করে। ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দু সরকারের সামনে তাই দুর্গা পুজোকে আরও বৃহৎ আকারে আয়োজনের রাজনৈতিক দায় রয়েছে। তাই ইডেনে মহালয়ার দিন মেগা শোয়ের মাধ্যমে নতুন সরকার বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যেমন তুলে ধরতে চাইছে, তেমনি পুজো নিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক বার্তাকেও প্রশাসনের কর্মসূচিতে রূপ দিতে চাইছে বলে মত অনেকের।
কলকাতার দুর্গাপুজো ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর কালচারাল হেরিটেজের স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা এই আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে পুজোর সময় বিশ্বের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা।
মহালয়ার মেগা অনুষ্ঠান সফল হলে পুজোর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই পর্যটকদের নজর কলকাতার দিকে ঘোরানো সম্ভব হবে। যার ফলে চাহিদা তৈরি হবে হোটেলে, বিমান পরিষেবায়, রেলে, পরিবহনে, খাদ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়।
ফলে এই মেগা প্রস্তুতি থেকে স্পষ্ট, রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলার প্রথম দুর্গা পুজোকে কোনভাবে ম্লান হতে দিতে চাইছে না শুভেন্দু সরকার, বরং মহালয়া থেকেই উৎসবের সূচনা করতে চাইছে নয়া সরকার। যার উদ্দেশ্য গোটা দেশ সহ বিশ্বের নজর পশ্চিমবঙ্গের দিকে ঘোরানো।

