Snaskar Bharati, Kolkata, ‘ভরত রস ও ভাব উৎসব’-এ প্রথম মহিলা রাজবন্দী ননীবালা দেবীকে স্মরণ করল সংস্কার ভারতী

মিলন খামারিয়া, আমাদের ভারত, কলকাতা, ১ এপ্রিল: গত ৩০ মার্চ ২০২৫, কলকাতার তপন থিয়েটার হলে, ভারত সরকারের আর্থিক সহযোগিতায়, অনুষ্ঠিত হলো ‘নয়াবাদ তিতাস’ নাট্য সংস্থার উদ্যোগে ‘ভরত রস ও ভাব উৎসব ২০২৫’ শীর্ষক নাট্য উৎসবের প্রথম পর্যায়ের অনুষ্ঠান। প্রদীপ জ্বালিয়ে এই বর্ণাঢ্য উৎসবের সূচনা করেন ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডিরেক্টর জেনারেল অজয় প্রতাপ সিং, ‘অখিল ভারতীয় সংস্কার ভারতী’র সম্পাদিকা নীলাঞ্জনা রায়, পদ্মশ্রী পূর্ণদাস বাউল এবং বিশিষ্ট লেখক দিলীপ মজুমদার সহ বাংলা নাট্য জগতের একগুচ্ছ নবীন প্রবীণ পরিচালক ও নাট্যকর্মী।

এই উৎসবে ‘নয়াবাদ তিতাস’ সম্মানিত করে পদ্মশ্রী পূর্ণদাস বাউল এবং দিলীপ মজুমদারকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে অজয় প্রতাপ সিং বলেন, সংস্কৃতি ও সংস্কার রক্ষার্থে এই ধরণের উদ্যোগ প্রশংশনীয়। নীলাঞ্জনা বলেন, নাটককে অশ্লীল ভাষা এবং কুরুচিকর অঙ্গ-ভঙ্গির প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হবে।

এদিনের নাট্য উৎসবে মোট চারটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। প্রথম নাটক মঞ্চস্থ করে ‘কষবা অর্ঘ্য’। মণীশ মিত্র রচিত ও নির্দেশিত এই নাটকের নাম ‘জাস্ট এন আওয়ার’। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। এই নাটকে, এক যুবক, যে আত্মহত্যা করেছে এবং মৃত্যুর পর সে তার উপলব্ধি ব্যক্ত করছে যে, সে কত বড় ভুল করেছে এবং জীবনকে অমর্যাদা করে সে অনুতপ্ত। নাটকটি আজকের প্রজন্মের কাছে একটি শক্তিশালী ও প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছে দেয়।

উৎসবের দ্বিতীয় নাটক ছিল ‘সংস্কার ভারতী পশ্চিমবঙ্গ’ দ্বারা প্রযোজিত নাটক ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’। অমিত দে রচিত ও নির্দেশিত এই নাটকে ভারতের প্রথম মহিলা রাজবন্দী, বিপ্লবী ননীবালা দেবীর জীবন ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তার আপোষহীন লড়াইয়ের গল্প মেলে ধরে। আমাদের রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান যখন ব্রিটিশ শাসনের প্রশংসা করছেন, সেই সময় সংস্কার ভারতীর এই নাটক আরও একবার সবার সামনে অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকারের প্রকৃত চরিত্র তুলে ধ’রে সত্যের সন্ধান দেয়। প্রায় পঁচিশ জন নবীন নাট্যকর্মী দ্বারা অভিনীত এই নাটক তার জমাট অথচ সরল চলন ও বুনোনের মাধ্যমে এবং নৃত্য ও সংগীতের সুযোগ্য ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শকের মন জয় করে নেয়।

এই উৎসবের তৃতীয় নাটক ছিল ‘থিয়েটার শাইন’ প্রযোজিত, শুভজিৎ বন্দোপাধ্যায় রচিত ও নির্দেশিত নাটক ‘তোমার ডাকে’। মূলত কোলাজ ধর্মী এই নাটক পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ধর্মের মৌলবাদী আচরণের সমালোচনা ক’রে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সম্মান প্রতিষ্ঠার বার্তা দেয়।

এই উৎসবের চতুর্থ ও শেষ প্রয়োজনা ছিল ‘অনীক’ নাট্য সংস্থার নাটক ‘হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা’। নাটকটি রচনা করেছেন নীলাদ্রি মুখার্জি এবং পরিচালনা করেছেন ভাস্কর বণিক। এই প্রজন্মের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার ছবি মেলে ধরে এই নাটক। কীভাবে, কোন প্রভাবে, বাবা মায়ের উপর নির্ভরশীল সরল কিশোর, যৌবনে সব বন্ধন মুক্ত হতে চেয়ে ভুল পথ অবলম্বন ক’রে এবং জীবনের ঘাত প্রতিঘাতে পুড়ে সম্পর্কের আসল গুরুত্ব বা প্রয়োজন আবার নতুন করে উপলব্ধি করে; এই নাটকটি সুন্দর ভাবে তা ব্যক্ত করেছে। একদল তরুণ প্রতিভা এই নাটককে খুব যত্ন করে বয়ে নিয়ে গেছে।

এই উৎসবের গুরুত্ব প্রসঙ্গে ‘নয়াবাদ তিতাস’-এর সম্পাদিকা শর্বরী মুখার্জী বলেন,নাট্য উৎসব হল আসলে মেলবন্ধন ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যম। আমাদের লক্ষ্য থাকবে এই মেলবন্ধন যেন রাজ্য থেকে পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। আমরা সচেতন ভাবেই এই নাট্য উৎসবে ভরত মুনির নাম উল্লেখ করেছি, যাতে যতবার উৎসবের নাম উল্লেখ হবে ততবার ভরত মুনিকে এবং তাঁর সৃষ্ট রস ও ভাব নিয়ে কাজ ক’রে তাঁর কাজকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে পারি।

এই উৎসব সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংস্থার সভাপতি অভিজিৎ কুমার রায় বলেন,আমরা এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে,আমাদের পুরোনো কিছু অভ্যাস – যা প্রায় বিস্মৃত হতে চলেছে, তা আবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। যেমন বই পড়া ও উপহার হিসেবে বই দেওয়া। তাই উৎসবের অঙ্গ হিসেবে আমরা দু’খানি বুকস্টল রেখেছি।

উৎসবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংস্থার গুরু মনোজ কুমার সাহা (আবির) বলেন, এ রাজ্যের মানুষ ইতিহাস বিস্মৃত এবং চর্চার অভাবে নিজেদের সংস্কৃতিকে ভুলে যাচ্ছে। আমাদের এই নাট্য উৎসবে আমরা সেই সব নাটককে প্রাধান্য দেব- যে নাটক আমাদের শিকড়ের কথা মেলে ধরবে।

এই নাট্য উৎসবে পূর্ণদাস বাউল ও তাঁর সুযোগ্য পুত্র দিব্যেন্দু দাস বাউলের সঙ্গীত উপস্থিত দর্শকদের অনাবিল আনন্দ ও তৃপ্তি দান করে।গান গেয়ে মাতিয়ে দেন দীপ্তার্ক ধর এবং ‘ক্লাউন থিয়েটার’ পরিবেশন ক’রে দর্শকের মুখে হাসি ফুটিয়ে অনাবিল আনন্দ দেন পুরুষোত্তম রায়।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্ব খুব প্রশংসনীয় ভাবে পালন করেন প্রেমাঞ্জন দাশগুপ্ত। ‘নয়াবাদ তিতাস’ নাট্য সংস্থার ‘ভরত রস ও ভাব উৎসব – ২০২৫’ এর প্রথম পর্যায় সার্থকতার সঙ্গে, প্রায় হল ভর্তি দর্শকের প্রশ্রয়ে, ভালোবাসায় অনুষ্ঠিত হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *