পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৪ অক্টোবর: শারদোৎসবের আবহে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর শহর সেজে উঠেছে বর্ণময় আলোকসজ্জা ও অভিনব থিমের সাজে। শহরের প্রাচীনতম দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম রাঙ্গামাটি সর্বজনীন দুর্গোৎসব এ বছর ৫৮তম বর্ষে পদার্পণ করল। প্রতি বছরের মতো এ বছরও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে অভিনব ভাবনায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে পুজো মণ্ডপ। এবারের পুজোর থিম ‘কল্লোলিনী কলকাতা’। কলকাতার প্রাচীন ঐতিহ্য, স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং শহরের চিরচেনা জীবনযাত্রার নানা ছবি নিপুণ শিল্পকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপের প্রতিটি কোণে।
তৃতীয়ার পুণ্যলগ্নে এই পুজো মণ্ডপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলার পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা, জেলার অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিক এবং মেদিনীপুরের বিধায়ক ডঃ শঙ্কর কুমার গুছাইত- সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের উপস্থিতিতে উৎসবের আবহে উদ্বোধন করা হয় এ বছরের আকর্ষণীয় পুজো মণ্ডপের।

থিমের পরতে পরতে কলকাতার ঐতিহ্য—
এ বছরের থিম ‘কল্লোলিনী কলকাতা’-র মধ্যে দিয়ে কলকাতা শহরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা। মণ্ডপসজ্জায় স্থান পেয়েছে কলকাতার বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী মন্দির থেকে শুরু করে হাওড়া ব্রিজ, কলকাতার পরিচিত নানা নিদর্শনকে শিল্পসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই মণ্ডপে। পাশাপাশি কলকাতার একসময়ের অন্যতম পরিচিত যান হাতে টানা রিক্সার প্রতিরূপও বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
শুধু স্থাপত্য কিংবা যানবাহনের প্রতিচ্ছবি নয়, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার নানা দিকও তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপসজ্জায়। শহরের পুরনো দিনের স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের পরিচিত ছবিগুলিকে এক সুতোয় বেঁধে দর্শনার্থীদের সামনে কলকাতার এক বিশেষ রূপ তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা।
মণ্ডপের অন্দরেই যেন কুমোরটুলি—
এই পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মণ্ডপের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে ভিতরের বিস্তৃত সজ্জা। প্রবেশদ্বারের উপরেই রয়েছে ‘কুমোরটুলি’ নামের পরিচিতি। এরপর মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলির পটুয়াপাড়ার নানা দৃশ্য। প্রতিমা তৈরির প্রাথমিক কাজ থেকে শুরু করে মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের কারুকার্য, সমস্ত কিছুই শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মাটির প্রতিমা গড়ার বিভিন্ন পর্যায়, প্রতিমা নির্মাণের খুঁটিনাটি এবং শিল্পীদের কর্মব্যস্ত পরিবেশকে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা শুধু একটি পুজো মণ্ডপ দেখার সুযোগই পাচ্ছেন না, বরং কলকাতার প্রতিমা শিল্পের ঐতিহ্য ও কুমোরটুলির শিল্পীদের সৃজনশীল জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন।
ঐতিহ্য ও শিল্পের মেলবন্ধনে বিশেষ আকর্ষণ—
দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী আরাধনা নয়, বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উদ্যাপনও। সেই ভাবনাকে সামনে রেখেই রাঙ্গামাটি সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এ বছরের থিমে কলকাতার ঐতিহাসিক পরিচয় এবং প্রতিমা শিল্পের পরম্পরাকে তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আধ্যাত্মিক আবহ, হাওড়া ব্রিজের স্থাপত্যগত পরিচিতি, হাতে টানা রিক্সার পুরনো দিনের স্মৃতি এবং কুমোরটুলির পটুয়াপাড়ার শিল্পকর্ম, সব মিলিয়ে মণ্ডপটি হয়ে উঠেছে কলকাতার ঐতিহ্যের এক প্রতীকী উপস্থাপনা।
মেদিনীপুর শহরের এই প্রাচীন পুজোকে ঘিরে প্রতি বছরই দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ থাকে। এ বছর ‘কল্লোলিনী কলকাতা’ থিমের মাধ্যমে কলকাতার হারিয়ে যেতে বসা নানা স্মৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা পুজো মণ্ডপকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে শুরু হলো রাঙ্গামাটি সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এ বছরের শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক পথচলা। এখন উৎসবের দিনগুলিতে এই মণ্ডপে কলকাতার ঐতিহ্য ও শিল্পকলার এই অভিনব উপস্থাপনা দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় জমবে বলেই আশা উদ্যোক্তাদের।

