আমাদের ভারত, ২৮ জুলাই: হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে নোংরা হয়ে ছিঁড়ে গেছে, অথবা কখনো ভুল করে ওয়াশিং মেশিনে জামা কেচে ফেলায় পকেটে থাকা কাগজের নোট ভিজে দুমড়ে মুছড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এবার সেসব দিন শেষ হতে চলেছে। সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট করেছে সত্যিই বাজারে আসতে চলেছে দীর্ঘস্থায়ী প্লাস্টিকের নোট। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ টাকা ও ২০ টাকার নোট দিয়ে শুরু হচ্ছে ভারতীয় মুদ্রার নতুন সফরনামা।
সোমবার লোকসভায় এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে, ১০ টাকা এবং ২০ টাকার পলিমার নোট- এর পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পাঠানো প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।
সংসদে পেশ হওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আইনে ১৯৩৪ সালের ২৫ নম্বর ধারার আইন মেনে আর বি আই- এর সেন্ট্রাল বোর্ডের সুপারিশ মেনে এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়। প্রাথমিক ট্রায়ালের জন্য ১০ টাকার ১০০ কোটি পিস এবং ২০ টাকার ১০০ কোটি পিস পলিমার নোট ছাপানো হবে।
পরীক্ষামূলক ব্যবহার সফল হলে পরবর্তী সময়ে এই দুই মূল্যের প্লাস্টিক নোট নিয়মিত বাজারে ছাড়ার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, কাগজের নোট রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। কাগজের নোটের পাশাপাশি বিকল্প ও পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এই প্লাস্টিক নোট।
আন্তর্জাতিক নানা গবেষণায় দেখা গেছে সাধারণ কাগজের নোটের তুলনায় পলিমার বা প্লাস্টিক নোটের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। সহজে ছেড়ে না জলে ভেজে না এবং নোংরাও হয় কম। বর্তমানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাথা ব্যাথার অন্যতম কারণ কাগজের নোট ছাপানোর খরচ এবং ছেড়া ফাটা নোটের পাহাড়।
আর বি আই- এর সাম্প্রতিক বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী কেবল ২০২৪-২৫ অর্থ বর্ষে কাগজের নোট ছাড়তে সরকারের খরচ হয়েছে ৬৩৭২ কোটি টাকা, যা আগের বছরগুলি তুলনায় অনেকটা বেশি।
গত অর্থ বছরে প্রায় ২৩৮০ কোটি নষ্ট বা ছেঁড়া- ফাটা নোট বাজার থেকে তুলে নিয়ে ধ্বংস করতে হয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে। এর মধ্যে ৫০০ এবং ১০০ টাকার নোটই ছিল সর্বাধিক। প্লাস্টিকের নোট চালু হলে এই নষ্ট হওয়ার প্রবণতা ও নোট ধ্বংস করে নতুন করে ছাপানোর বিশাল খরচ কমবে।
ইউপিআই এবং ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপক রমরমা সত্ত্বেও কিন্তু দেশে নগদের চাহিদা কমেনি বরং বেড়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে এই মুহূর্তে রেকর্ড ৪২.৮৬ লক্ষ কোটি টাকার নগদ ঘুরছে। বিশেষ করে দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনাকাটার ক্ষেত্রে ১০ টাকার ২০ টাকার মত ছোট নোটের চাহিদা তুঙ্গে, কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে কাগজের ১০ থেকে ২০ টাকার যোগান কম এবং সেগুলি দ্রুত নোংরা বা নষ্ট হয়ে যায়। অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, ডিজিটাল লেনদেন এবং কাগজের প্লাস্টিকের নোট একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
প্লাস্টিক নোট আনার চেষ্টা ভারতে প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালে ইউপিএ সরকারের আমলেও দেশের পাঁচটি শহরে পরীক্ষামূলকভাবে ১০ টাকার প্লাস্টিকের নোট চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন এটিএম- এর প্রযুক্তিগত সমস্যা ও প্রসেসিং কাঠামোর অভাবে সেই প্রজেক্ট মাঝপথে থমকে যায়। সরকার জানিয়েছে, এবার সেই প্রযুক্তিগত বাধার জটিলতা দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব ইতিমধ্যে প্রায় ৬০টি দেশে সফলভাবে পলিমার বা প্লাস্টিকের নোট ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম এই নোট চালু করে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো এশিয়ার দেশে তো বটেই, ইউরোপের রোমানিয়া ও কানাডাতেও কোথাও পুরোপুরি, কোথাও আবার আংশিকভাবে পলিমার কারেন্সি ব্যবহার হয়। এবার এই দলে নাম লেখাতে চলেছে ভারতও।

