রহড়া-খড়দার অতীতের দিনগুলি! সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের দিকেও কড়া নজর রাখত বামপন্থীরা

ছবি: রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন।

(খড়দার ভূমিপুত্র কৃষিবিজ্ঞানী ড. কল্যাণ চক্রবর্তী খড়দায় একাদিক্রমে ৩৫ বছর অবস্থান করেছেন। তার সঙ্গে খড়দার মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক-সামাজিক যোগসূত্র আজও বিনষ্ট হয়নি। তিনি আপন-চারণায় সমকালীন সময়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, তার মধ্যে সেই সময়ের স্থানীয় ইতিহাস কিছুটা ফুটে উঠবে এই আশায় তা পরিবেশিত হল। তিনি ব্যক্তিবিশেষকে আক্রমণ করার লক্ষ্যে এই ধারাবাহিক নিবন্ধ লিখছেন না, লিখছেন নিজেকে অবিরত জানতে, নিজের ফেলে আসা পথটির স্বরূপসন্ধান করতে, যাতে আগামীদিনে আরো নির্মল ভাবে সকলকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে পারেন। প্রতিবেদনটি তাঁর তৃতীয় পর্ব)

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

আমাদের ভারত, ২১ ডিসেম্বর: ১৯৯০ সাল, তখন আমি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। খড়দহের যুবকবৃন্দ সূর্যসেন নগরে বসে ঠিক করলেন একটি স্থানীয় পত্রিকা প্রকাশ করবেন, যার মধ্যে এলাকার ঐতিহ্য ও প্রাচীনত্বের ছোঁয়া থাকবে আর স্থানীয় সংবাদই পরিবেশন করা হবে। আমার এক বামপন্থী বন্ধুরও ইচ্ছে আমি পত্রিকাটিতে যুক্ত থাকি, কারণ নিরপেক্ষ কেউ সম্পাদনায় থাকলে সকলের গ্রহণযোগ্য হবে।

তখন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সকল কাজ তদানীন্তন শাসক দল/উপদল/দলীয় গোষ্ঠী সবসময় চোখে চোখে রাখত। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখালেখি করতাম, ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভ না হয়েও ছাত্র সংসদের পত্রিকা সম্পাদনার মন্ডলীতে ছিলাম, জানতেন সবাই। সেই সূত্রে আমাকেই খড়দহের স্থানীয় পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিতে সকলে অনুরোধ করলেন। পত্রিকা প্রকাশের আগে দেওয়ালে রঙিন পোস্টার সাঁটা হতে লাগলো,

“আসছে…আসছে… আসছে….সোনাইবার্তা আসছে।”

এখনও মনে আছে, পোস্টার এবং পত্রিকার প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করলেন আশিস মুখার্জি। বামশাসন তখন তেরো বছর অতিক্রান্ত, স্বজনপোষণ, ধমকানি-চমকানির পাঠ রীতিমতো চালু হয়ে গেছে, বিভিন্ন সরকারি/আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিচালক মন্ডলীর বহু মানুষ লাল পতাকার নিচে নিজের স্থায়ী আসন পেতে বসেছেন। পাশাপাশি শুরু হয়েছে রকমারি গুঞ্জন, না-পাওয়ার দলের মানুষের ক্ষোভ, দেখলাম গরিব দ্বিবিধ — বামপন্থী গরিব এবং অবামপন্থী গরিব। বুঝলাম, খড়দার মতো এলাকায় এই দ্বন্দ্বসমাসের সংবাদ তুলে ধরতে পারলে, বিরোধী রাজনীতি ও রাজনীতিবেত্তার দরকার হবে না, এ ব্যাপারে বামপন্থী মানুষ নিজেরাই স্বয়ংসিদ্ধ। সম্পাদনার দায়িত্ব নিলাম।

১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হল পাক্ষিক সংবাদপত্র ‘সোনাইবার্তা’। সোনাই একটি নদীর নাম। খড়দহে রহড়ার পূর্ব দিকে একসময় বয়ে যেত এই ছোটো নদী, ধীরগতির, নাব্যতা ছিল, ভালো নাম ‘সুবর্ণবতী’, তা থেকে ‘সোনাই’। কাছাকাছিই বইতো আর একটি নদী ‘লাবণ্যবতী’, তা থেকে ‘নোয়াই’। নোয়াই নদী এখন খাল হয়ে বেঁচে থাকলেও, সোনাই নদী পর পর সারিবদ্ধ পুকুর এবং দখলীকৃত গৃহাবাস হিসাবে আজ হারিয়ে গেছে। সে এক নদীচুরির অফুরন্ত গল্প, খড়দাবাসী কান পাতলে আজও শুনতে পারবে কারা নদী বেচে দিতে গেছিল হাটে! এক বেদনাঘন খড়দহ-জানপদিক কাহিনী, যাক সে সত্য-কথন।

নদীর নামে পত্রিকায় নদী-দুর্নীতির সংবাদ আগামী দিনে নিশ্চয়ই থাকবে, এরকমটাই চেয়েছিলাম আমরা। পত্রিকা যখন প্রকাশ হল (১৬ ই জানুয়ারি, ১৯৯১) তখন উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছে, অথচ খড়দার বাজারগুলিতে বাড়ছে জিনিসের দাম। অদ্ভুত ব্যাপার হল, রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। মানুষ বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, প্রতিকার জানানোর উপায় নেই। আমার অনুরোধে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রম উচ্চ বিদ্যালয়ের এক স্বনামধন্য শিক্ষক বাজার পরিক্রমা করে প্রতিবেদন লিখলেন, কোন বাজারে কোন জিনিসের কী দাম, যুদ্ধের আগে-পরে জিনিসের কী দাম। তিনি নিজের নামে লিখতে চাইলেন না, ‘সোনাইবার্তার প্রতিবেদন’ বলে ছাপানো হল,

“উপসাগরে যুদ্ধ – খড়দায় বাড়ছে জিনিসের দাম”।

প্রথম সংখ্যায় মিশনের শিক্ষক শ্রী অমিত কুমার রায় লিখলেন নেতাজীর মহানিষ্ক্রমণ বিষয়ে, সেই সময়টি নেতাজীর আবির্ভাব পক্ষ। রহড়া-খড়দার সমস্ত বিদ্যালয়গুলিতে সাংবাদিক পাঠিয়ে সরস্বতী পূজা বিষয়ে বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার চিত্র তুলে ধরা হল, এভাবেই করলাম সরস্বতী বন্দনা।

এরপর একের পর এক সাংকেতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকলে শাসকদলের টনক নড়ল। বিশেষ করে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ার সংবাদ বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে প্রকাশিত হলে কল্যাণ নগর বিদ্যালয়ের তদানীন্তন প্রধানশিক্ষকের অস্বস্তি অসম্ভব বেড়ে গেল। তিনি সেইসময় বিদ্যালয়ের কাজে মনোনিবেশ না করে পার্টির কাজ ও পুরসভার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ‘প্রতিবেদনের থাপ্পর’ (অনেকের মতে) তাঁকে তো যত্নবান করলই না, যে প্রতিবেদক এটি লিখলেন, তার উপর প্রবল চাপ দিয়ে পত্রিকা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। তবুও পত্রিকা সম্পাদনার কাজ বন্ধ হল না। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী বহু ছাত্র এগিয়ে এলেন সংবাদ দিতে, লিখতে, প্রুফ দেখতে, পত্রিকা বেচতে। এর মধ্যে যাদের নাম মনে পড়ছে তাদের অন্যতম হলেন অনিন্দ্য কান্তি হালদার– বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, ডাক্তার অমিত ভট্টাচার্য, অমিতাভ ব্যানার্জি প্রমুখ।

এক বামপন্থী যুবক পত্রিকাটিকে খুব ভালোবাসতেন, তার খেসারত তাকে অবশ্য পরে দিতে হয়েছে। তখন কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টির প্রভাব খড়দহের বুকে তেমন ছিল না, তবুও সম্পাদক হিসাবে তাদের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, সংবাদ কিছু দেবার আছে কিনা জিজ্ঞেস করতাম। তাদের সাংগঠনিক কিছু খবর, রক্তদান শিবির ইত্যাদির খবর পরিবেশনে কার্পণ্য দেখাইনি। পত্রিকা চালাতে ক্রমেই অর্থের যোগানে টান পড়তে লাগলো। পত্রিকা বিক্রি করিয়ে, বিক্রয়কর্মীকে কমিশন দিয়ে চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। যদি শাসকদলকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করা যেতো, যেমনটি রহড়া-খড়দার বহু পত্র-পত্রিকা করে থাকে, তবে পুরসভার বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে নানান প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ঘরে বসে চলে আসতো। ‘সোনাইবার্তা’-র কপাল তেমন উঁচু ছিল না, সোনাই নদীর মতোই এই পত্রিকা হজেমজে গেলো। কিন্তু বাম-জামানায় জন্ম দিয়ে গেল বাক-স্বাধীনতার এক নতুন যুগ। এই পত্রিকা সমসাময়িক কালে বহু সাংবাদিকের জন্ম দিয়েছে, তারা নানান পত্রিকায় পরে যুক্ত হয়েছেন। পত্রিকা পরিচালক মন্ডলীকে দায়িত্ব দিয়ে এক চা-বাগানের ম্যানেজারি নিয়ে চলে গেলাম দার্জিলিং, উদ্দেশ্য প্রিয় পত্রিকার জন্য নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিতে পারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারপর একটি সংখ্যাও প্রকাশ পায়নি।

পরে চা-বাগানের চাকরি ছেড়ে যখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিএআর ফেলোশিপ নিয়ে স্নাতকোত্তরে পড়তে এলাম, তখন পত্রিকার প্রতি শাসকদলের উদাসীনতা বেশ প্রবল। ফলে স্থানীয় যুবকদের উৎসাহিত করা গেল না। কথায় বলে পার্টির নির্দেশ ছাড়া তখন একটি গাছ পাতাও ফেলতে পারত না। পরিচালক মন্ডলীর অনুমোদন নিয়ে পাক্ষিক থেকে মাসিক পত্রিকায় রূপান্তরিত করে ফার্ম জার্নাল করা হল। সোনাইবার্তা বলতে সোনালী বার্তাও বোঝাতে পারল। ফসলের সোনা রঙ। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গবেষক ও অধ্যাপকদের দ্বারা কয়েক বছর তা নিয়মিত প্রকাশিত হল। অধ্যাপক রাধাগোবিন্দ মাইতি ছিলেন তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। পৃষ্ঠপোষক মন্ডলীর অন্যতম ছিলেন স্বনামধন্য অধ্যাপক ও বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. বিশ্বনাথ চ্যাটার্জি। আমাকে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ অবধি তার প্রকাশক হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হল, সম্পাদক হলেন ড. সুবোধ কুমার মল্লিক, তিনি বর্তমানে রাজ্য সরকারের একজন আধিকারিক। ১৯৯৩ সালে আমি সরকারি আধিকারিক হিসাবে যোগদানের পূর্বে পত্রিকার প্রকাশক পদ থেকে পদত্যাগ করলাম। সম্ভবত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একজন অধ্যাপক তারপর পত্রিকার প্রকাশক হিসাবে দায়িত্ব নেন। এই কৃষি পত্রিকা বহু ছাত্র-ছাত্রীকে কৃষি সাংবাদিকতা হাতে কলমে শিখিয়েছে, তারা এখন সবাই নানান সরকারি/বেসরকারি উচ্চপদে অবস্থান করছেন। এখানেই ‘সোনাইবার্তা’-র সোনালী ফসলের দ্যুতি, ছড়িয়ে গেছে দিগন্তে, সোনা রঙ হয়ে। ——— ( ক্রমশ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *