আমাদের ভারত, মালদা, ১৮ জানুয়ারি: এক ঝলক দেখে মনে হবে লাউ বা সেই জাতীয় অন্য কোনও আনাজ৷ কিন্তু কাছে গেলেই ধারণাটাই পালটে যাবে৷ লাউ কিংবা চালকুমড়ো নয়, এ হল বাঙালির প্রিয় সবজি বেগুন৷ লাউয়ের মতোই লম্বা ও সবুজ রঙ৷ একেকটি ওজনে দেড় থেকে দুই কিলো কিংবা তারও বেশি৷ চলতি ভাষায় এই বেগুন নবাবগঞ্জের বেগুন নামেই পরিচিত৷ শীতের মরশুমে এই বেগুনের চাহিদা জেলা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিদেশেও৷ যদিও এই বেগুন চাষের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে৷

অনেক আগে রতুয়া ২ ব্লকের নাগরি নদীর ধারে কয়লাবাদ গ্রামে এই প্রজাতির বেগুন প্রথম চাষ হয়েছিল৷ ধীরে ধীরে পুরাতন মালদা ও গাজোল ব্লকের কয়েকটি গ্রামে এই বেগুন চাষ ছড়িয়ে পড়ে৷ ধোপদুরস্ত চেহারার জন্য এই বেগুনকে প্রথমে পলিয়া বেগুন নামেই চিনত সবাই। সেই সময় জেলার প্রধান হাট ছিল পুরাতন মালদার নবাবগঞ্জে৷ এই হাটেই পাইকাররা আসতেন৷ ফলে এই বেগুন নিয়ে সেই হাটেই যেত চাষিরা৷ এই জন্য ধীরে ধীরে এই বেগুন, নবাবগঞ্জের বেগুন নামে পরিচিতি পায়৷ এখন সময় বদলেছে, কিন্তু বেগুনের কদর আগের মতোই রয়ে গিয়েছে৷ তবে এখনও এই বেগুনের চাষ বিস্তৃতি পায়নি৷ এর অন্যতম কারণ, এই বেগুনের চাষিরা চাষের কৌশল প্রকাশ করে না৷ এমনকি এই বেগুনের বীজও তারা বাইরে বের করে না৷ একাধিক বীজ তৈরির সংস্থা এই চাষিদের কাছে বিশেষ বেগুনের বীজ সংগ্রহ করতে গেলেও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে৷ তবে বর্তমানে কিছু নার্সারি নিজেদের উদ্যোগে এই প্রজাতির বেগুনের চারাগাছ বিক্রি করে৷ যদিও সেটা নগণ্য৷ নবাবগঞ্জের বেগুন এখন মালদার একটা ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
চলতি মরশুমে রতুয়া ২ ব্লকের রাজাপুর গ্রামের মাত্র চারজন চাষি এই বেগুন চাষ করেছেন৷ তাঁদেরই একজন ফটিক শেখ৷ তিনি জানান, ”বর্তমানে এই বেগুন আমাদের এখানেই হয়ে থাকে৷ এই চাষ সবাই করতে পারবেন না৷ তবে দীর্ঘদিনের ব্যবহারের পর এই বেগুনের বীজ শোধন করে উন্নতমানের করা প্রয়োজন৷ এখন প্রতিটি বেগুন দেড় থেকে দুই কিলো ওজনের হয়৷ আগে একেকটি বেগুনের ওজন অন্তত তিন কিলো হত৷ কিন্তু ওজন এত হলেও বেগুনে বীজ থাকত না৷ এখনও দু’কিলো ওজনের বেগুনে কোনও বীজ থাকে না৷ এই বেগুন এক বিঘা জমিতে চাষের জন্য এখন খরচ হয় ৪০-৫০ হাজার টাকা৷ তবে এই বেগুন চাষ অত্যন্ত লাভজনক৷ প্রতি বিঘাতে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ হয়৷ আমি ১৬ বছর ধরে এই বেগুনের চাষ করছি৷ এবছর বেগুনের দাম অনেক বেশি৷ পাইকারদের কাছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কিলো দরে বেগুন বিক্রি হয়৷ খোলা বাজারে এই বেগুনের দাম কিলোপ্রতি ১০০ টাকাও হয়ে যায়৷ এবার অতিবৃষ্টিতে বেশিরভাগ জমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে৷ তাই বেগুনের দাম এত বেশি৷ এই বেগুন চাষের জন্য বিশেষ কৌশল রয়েছে৷ তবে তা আমাদের গোপন
ব্যাপার৷”

ফটিক এই বেগুন চাষের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে না চাইলেও এটুকু নিশ্চিত, নবাবগঞ্জের বেগুন চাষের জন্য পলিমিশ্রিত দোঁয়াশ মাটি প্রয়োজন৷ সেকারণেই এই প্রজাতির বেগুন চাষের জমিগুলি সবই নদীর ধারে৷ রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করলে ফলন ভালো হয়৷ বিশেষত গোবর সার এই বেগুন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী৷ জমির চারপাশ এবং উপরের অংশ জাল দিয়ে ঘিরে রাখতে হবে৷ যাতে কোনও পাখি কিংবা জন্তু জমিতে প্রবেশ করতে না পারে৷ রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব কীটনাশক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ৷ সবচেয়ে বড়ো বিষয়, জমিতে জল দাঁড়াতে দেওয়া চলবে না৷ জলের পরিমাণ বেশি হলে বেগুন গাছ নষ্ট হয়ে যাবে৷ কোন সময় কতটা জলের প্রয়োজন, একজন বিচক্ষণ চাষিই তা সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন৷

