“নন্দীগ্রাম নিয়ে চিন্তিত নই, আমি চিন্তিত গণতন্ত্র নিয়ে” প্রায় ২ ঘন্টা অবরুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পর বললেন মমতা

আমাদের ভারত, ১ এপ্রিল: বাইরে দু’পক্ষের মধ্যে প্রায় সংঘর্ষের পরিস্থিতি নন্দীগ্রামের বয়ালে। ফলে সেই সময় বুথের ভেতর একরকম অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রায় দুই ঘন্টা বসে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষে কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্য পুলিশ এবং কমিশনের অধিকারীদের কড়া নিরাপত্তায় তাঁকে বের করে আনা হয়। মূল রাস্তা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার ভেতরে গ্রামের মধ্যে অবস্থিত ছিল ছিল ওই বুথ। হুইল চেয়ারে বসেই ওই বুথে যান মমতা। বেরিয়ে এসে স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, “নন্দীগ্রাম নিয়ে চিন্তিত নই, আমি গণতন্ত্র নিয়ে চিন্তিত। আমি মা মাটি মানুষের আশীর্বাদ নিয়ে জিতবই।”

দ্বিতীয় দফার ভোট শুরুর কিছুক্ষণ পরই ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ ঘিরে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয় নন্দীগ্রামের বয়ালে। পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে দুপুর ১:১৫টা নাগাদ রেয়াপাড়ার ভাড়াবাড়ি থেকে বের হন মমতা। বয়ালের ভক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ নম্বর বুথে যান। গ্রামের ভিতরে যেতেই রাস্তায় তাঁকে তৃণমূল সমর্থকরা অভিযোগ করেন বুথ বিজেপি দখল করে নিয়েছে অবাধে ছাপ্পা ভোট হচ্ছে সেখানে, তৃণমূলের এজেন্টকে পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তাদের রুখতে কেন্দ্রীয় বাহিনীও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এরপরই সোজা ওই বুথে পৌঁছান মমতা।‌ সেখানে তিনি পৌঁছতেই উত্তেজনা চরমে ওঠে। বুথে ঢোকার মুখে মমতাকে দেখে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিতে শুরু করে বিজেপি কর্মী সমর্থকরা। তাতে তাদের তেড়ে যান তৃণমূল সমর্থকরা। দু-পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। উভয় পক্ষই এলোপাথাড়ি ইট বৃষ্টিতে মেতে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসে রাজ্য পুলিশ। দুই শিবিরকে আলাদা করেন তারা। কিন্তু বুথের বাইরের এই ধুন্ধুমার পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না পর্যন্ত বুথের ভেতরে আটকে থাকেন মমতা। এমনকি তাঁকে অন্য রাস্তা দিয়ে বার করে নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু হয়। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে কেন্দ্রীয় বাহিনী না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

শেষ পর্যন্ত পুলিশের তরফে মানব শৃঙ্খল করে বিক্ষোভকারীদের আটকানোর চেষ্টা হয়। বয়ালের ধুন্ধুমার কান্ডের সময় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, খেলা যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ওই বুথের ৭০ শতাংশ ভোট হয়ে গেছে। সকাল থেকে ভোট হয়ে গিয়েছে। এখন গিয়ে আর কিচ্ছু করার নেই মমতার। এরপরই বুথে বসে মমতা অভিযোগ করেন যে বুথে ৮০% ছাপ্পা ভোট হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উস্কানিতে বহিরাগতদের এনে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা চলছে। বিহার, উত্তরপ্রদেশের গুন্ডারা এসে ঝামেলা পাকাচ্ছে। যারা ঝামেলা করছে তাদের একজনও বাংলা জানে না। সবাই হিন্দিতে কথা বলছে। মমতা বলেন, “আমরা আদালতে যাব, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। ৬৩টা অভিযোগ করেছি।”

বয়ালের ওই বুথে বসেই রাজ্যপাল জাগদীপ ধনকারকে ফোন করে তিনি জানান পরিস্থিতির কথা। কিন্তু মমতার অভিযোগ উড়িয়ে দেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, অবাঞ্ছিত কেউ যাতে বুথে না ঢোকেন তার জন্যই কেন্দ্রীয় বাহিনী রয়েছে। মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবেন তাতে অসুবিধা কোথায়? হেরে যাবেন বুঝে উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন মমতা। নির্বাচন কমিশনকে ভরসা করা উচিত তাঁর। সুষ্ঠুভাবে ভোট করা ওদের দায়িত্ব। আর ৮০ শতাংশ ছাপ্পা ভোট উনি নিজে চাইলেও করতে পারবেন না। নিজেরা ছাপ্পা ভোট করতে পারছেন না বলেই এইসব বলছেন।

এতকিছুর পরেও, দীর্ঘক্ষন অবরুদ্ধ হয়ে বসেছিলেন মমতা। তখন বিজেপি তরফে প্রশ্ন তোলা হয় একজন প্রার্থী এতক্ষণ কেন বুথে বসে বসে থাকবেন? সংবাদমাধ্যমের কাছে মমতা বলেন, নন্দীগ্রামে কিভাবে ভোট লুট হচ্ছে। কিভাবে মানুষকে ভোটদানে বাধা দেওয়া হচ্ছে। গোটা ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা গোটা দেশের সামনে তুলে ধরতে চান তিনি। তাই সেখানে রয়েছেন।

বুথের বাইরের পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার মত কোনও লক্ষণও সেই সময় ছিল না। কারণ ঘটনাস্থলে কেন্দ্রীয় বাহিনী যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না। নিরাপত্তার খাতিরেই মুখ্যমন্ত্রীকে সেই সময় বাইরে বের করে নিয়ে যাওয়া যায়নি। এরপর দুপুর ৩:১৫টা নাগাদ বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ঘটনাস্থলে যান নন্দীগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার নগেন্দ্র নাথ ত্রিপাঠী। তিনি কথা বলেন বিজেপি তৃণমূল উভয় দলের সমর্থকদের সাথে। পিছু হটতে অনুরোধ জানানো হয় উভয় পক্ষকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেই তৃণমূল নেত্রীকে নিরাপদে বার করে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছিলেন নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরাও। তাদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা বলে অভিযোগ জানান। তিনি জানান, তৃণমূলের এজেন্টকে বসতে দেওয়া হয়নি, ভোটদানে বাধা দেওয়া হয়েছে। তিনি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। এবিষয়ে তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একজন মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ধুন্ধুমার চললেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর পৌঁছাতে এত সময় লাগলো কেনো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *