পুরুলিয়ার বরাবাজারে পাথর খাদান লুঠ, কোটি টাকার রাজস্ব হাত ছাড়া

সাথী দাস, পুরুলিয়া, ১২ সেপ্টেম্বর: পুরুলিয়ার বরাবাজার থানার লটপদা অঞ্চলে অবাধে জাতীয় সম্পদ লুঠ হচ্ছে। দিন রাত বাদ নেই কোনও সময়। জেলার মানবাজার মহকুমার অন্তর্গত এই অঞ্চলে প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে এই চোরা কারবার। কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব কোষাগারে না গিয়ে ভাগ হয়ে যাচ্ছে এই ক্ষেত্রে যুক্ত থাকা বিভিন্ন মানুষের কাছে।

এই অঞ্চলের প্রায় অধিকাংশ জমি পাথুরে। লটপদা অঞ্চলের ১০টি গ্রাম জুড়ে পড়ে রয়েছে কয়েকশো একর সরকারি খাস জমি। এছাড়াও রয়েছে বনদপ্তরের জমি। প্রায় দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে বেশ কিছু পাথর মাফিয়া সেই জমিতে চোরা পথে বিস্ফোরক এনে তা ফাটিয়ে পাথর তুলে অবৈধ ক্রেসারে নিয়ে যাচ্ছে। সেই ক্রেশার থেকে বাড়ি তৈরী সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হওয়া চিপস তৈরী করে জেলার নানা প্রান্ত সহ ঝাড়খন্ডের বিভিন্ন জেলায় সরকারি চালান ছাড়াই চড়া দামে বিক্রি করছে অবৈধ পাথর মাফিয়ারা। এই বেআইনী খাদানে ডিনামাইট ফাটানো হচ্ছে অথচ ব্লক প্রশাসনের কাছে কোনও খবর নেই। বরাবাজার ব্লকের লটপদা গ্রাম পঞ্চায়েতের তালাডি, সরবেরিয়া, ধারগ্রাম, সহ একাধিক গ্রাম জুড়ে চলছে এই অবৈধ কারবার। দীর্ঘ বাম আমল থেকে চলে আসা এই অবৈধ কারবার প্রথমে স্থানীয় লোকজন চালু করে। তখন চলত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে, তাতে স্থানীয় যুবকরা এই বেআইনী খাদানে কাজ করতেন। যতো দিন গেছে এই বেআইনি খাদানের রাশ চলে গেছে জেলা থেকে ভিন রাজ্যের পাথর মাফিয়াদের হাতে, সঙ্গে এসেছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। ফলে কাজ হারিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। এই বেআইনি খাদান ও অত্যাধুনিক ক্রেসারের জন্য সরকারের যেমন রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে তেমনি গ্রামের গরিব মানুষরা নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

২০১৯ সালে লটপদা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাধান রীনা কিস্কু বিডিও বরাবাজারকে চিঠি দিয়ে এই বেআইনি খাদান বন্ধের জন্য জানান। তিনি বলেন, আমাদের স্থানীয় লোকজন চাপ দিচ্ছে বেআইনি পাথর খাদান বন্ধের জন্য। খাদান ও ক্রেসারের গ্রামের পাশে হওয়ায় থাকায় দূষণ ছড়াচ্ছে গ্রামে। আমার পঞ্চায়েত থেকে কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি, বিডিও অনুমতি দিয়েছে। আমি লিখিত ভাবে বরাবাজার বিডিওকে এই বেআইনি খাদান বন্ধ করার জন্য জানিয়েছি, তিনি বলেন কোনও ব্যবস্থায় নেওয়া হয়নি। বরাবাজার বিডিও এই ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাননি।

বরাবাজার পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রতুল মাহাতো স্থানীয় মানুষের কাজের দোহাই দিলেও বেআইনি খাদানের বিরূদ্ধে সেভাবে কিছু না বললেও তিনি সরকারি অনুমতি নিয়ে খাদান চালানো সুকৃতি পেবেলসের বিরূদ্ধে অভিযোগ তুললেন কিভাবে জেলা থেকে তাকে এই এলাকায় খনন কাজ চালানোর অনুমতি দেওয়া হল, তবে তিনি বলেন সব খাদান বেআইনি। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, আগে এইসব গ্রামের বেকার যুবকরা বেআইনী খাদানে ও ক্রেসারে কাজ করতেন, কিন্তু এখন কোনও কাজ নেই, যত দিন গেছে ততো অত্যাধুনিক মেশিন ব্যবহার করে ক্রেসারের পাথর ভাঙ্গার কাজ চলছে ফলে স্থানীয় যুবকদের হাতে কাজ নেই।

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে গ্রামের লোকজন সম্মিলিত ভাবে একটি লিখিত অভিযোগ করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর সহ জেলাশাসক পুরুলিয়া, বিডিও বরাবাজার, ডিএফও কংসাবতী রেঞ্জ, আইসি বরাবাজার সহ একাধিক দপ্তরে, কিন্তু কোনো তদন্ত হয়নি। ব্লক বা জেলা প্রসাশনের আধিকারিক যাদের এই বেআইনি কারবার বন্ধ করার কথা তারা উদাসীন থাকায় বুক ফুলিয়ে এই বেআইনি কারবার আরো বেড়েছে। এই এলাকায় সুকৃতি পেবেলস নামে একটি বেসরকারি সংস্থা ধারগ্রাম গ্রামের অদূরে সরকারি খাস জমিতে ৩৯ একর জায়গা নিয়ে খাদান চালানোর অনুমতি পায়। লিজ নিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে পাথর উত্তোলন করলেও বেআইনি পাথর মাফিয়াদের দাপটে কোটি টাকার ব্যাবসায় ক্ষতি হচ্ছে। সেই সংস্থার মালিক গৌরাঙ্গ মহাপাত্র বলেন, ১ বছর হল আমি কাজ শুরু করেছি কিন্তু আশেপাশের বেআইনি খাদান থেকে বেআইনি ভাবে বিস্ফোরক ব্যবহার করে পাথর তোলার জন্য ১ কোটিরও বেশি টাকা আমার ব্যাবসায় ক্ষতি হয়েছে। তার কথায় আশেপাশে প্রায় একশোর বেশি বেআইনি খাদান রয়েছে, তারা বছরে প্রায় ৬-৭ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করার পর বেআইনি খনন ও উত্তোলন বন্ধ করার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব বেশ কয়েকদিন আগে একটি জেলায় জেলায় টাস্ক ফোর্স গঠন করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ মতো এই জেলায় টাস্কফোর্স তৈরী হলেও এই এলাকায় এখনো পর্যন্ত টাস্কফোর্সের কোনও সদস্যের পা পড়েনি। ডিএল অ্যান্ড এলআরও সুপ্রিয় দাস বলেন, টাস্কফোর্স তৈরী হয়ে গেছে। জেলার এসডিওদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে তাদের কাছে রিপোর্ট আকারে জানাতে বলা হয়েছে কোন এলাকায় কতো বেআইনি খাদান রয়েছে। তিনি বলেন, যেখানে যেখানে বেআইনি পাথর খাদান বা ক্রেসার রয়েছে খুব তাড়াতাড়ি অভিযান চালিয়ে সব বন্ধ করা হবে।
এর আগেও গত জুলাই মাসে বেআইনি পাথর খাদান ও ক্রেশারের বিরূদ্ধে পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় ব্যানার্জি ও জেলা প্রশাসনের একটি দল যৌথ অভিযান চালায় একদিন অভিযান চলার পর কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *