পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৮ সেপ্টেম্বর: সামাজিক ন্যায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতার বার্তা নিয়ে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হলো ‘আন্তর্জাতিক সামাজিক বিজ্ঞান কনক্লেভ ২০২৬’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও বাণিজ্য অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত দু’দিনের এই কনক্লেভের মূল প্রতিপাদ্য, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জলবায়ু সহনশীলতা’। আয়োজক সভাপতি (Organising Chair) কলা ও বাণিজ্য অনুষদের মাননীয় অধ্যক্ষ অধ্যাপক অরিন্দম গুপ্ত এবং আহ্বায়ক অধ্যাপক নীলাঞ্জনা দাস চট্টোপাধ্যায়।

নিবন্ধনের মধ্যে দিয়ে মঙ্গলবার শুরু হয় প্রথম দিনের কর্মসূচি। এরপর বিবেকানন্দ সভাগৃহে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। স্বাগত ভাষণে মাননীয় অধ্যক্ষ অধ্যাপক অরিন্দম গুপ্ত বলেন, আজকের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কোনও একটি বিদ্যাক্ষেত্রের গণ্ডিতে থেকে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিভিন্ন শাখার গবেষকদের সম্মিলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে। এই আন্তঃবিষয়ক ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই কনক্লেভের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
উদ্বোধনী ভাষণে মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক দীপক কুমার কর গবেষণার সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, গবেষণা শুধু বিদ্যায়তনিক চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তার সুফল পৌঁছতে হবে মানুষের জীবন ও সমাজে। প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে জ্ঞানচর্চার যোগসূত্র গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন উপাচার্য।

কনক্লেভের আহ্বায়ক অধ্যাপক নীলাঞ্জনা দাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে কাছাকাছি আনা এবং দেশ- বিদেশের গবেষকদের একই মঞ্চে মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়াই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। গবেষণালব্ধ জ্ঞান যাতে নীতি- নির্ধারণ ও বাস্তব জীবনে কাজে লাগে, সেই দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁর মতে, এই কনক্লেভ ভবিষ্যতের গবেষণা, সহযোগিতা ও নতুন চিন্তার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক সুগত মার্জিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন ২০২১ সালের ব্লু প্ল্যানেট পুরস্কার প্রাপ্ত, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের প্রাক্তন সহ- সভাপতি এবং ২০০৭ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সহ- প্রাপক অধ্যাপক মোহন মুনাসিংহে। মূল বক্তব্য (Keynote Address) রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ১৬তম অর্থ কমিশনের সদস্য এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার গোষ্ঠী- প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড: সৌম্য কান্তি ঘোষ। বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান অনুষদের মাননীয় অধ্যক্ষ অধ্যাপক পারেশ চন্দ্র জানা।

অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয় কনক্লেভের ‘স্মরণিকা ও সারসংক্ষেপ সংকলন’। সামাজিক বৈষম্য কমানো, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন, টেকসই অগ্রগতি এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণার ভূমিকা উঠে আসে আলোচনায়।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সুগত মার্জিত। আলোচনায় অংশ নেন এলজে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরকালীন অধ্যাপক ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অমিতাভ কুণ্ডু, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক গোপা সামন্ত এবং পদ্মশ্রী (২০২৩) সম্মানপ্রাপ্ত, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ুর্বেদ বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও অধ্যাক্ষ অধ্যাপক মনোরঞ্জন সাহু। উন্নয়ন, সমাজ, পরিবেশ ও মানব কল্যাণের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক।
দুপুরের পর বসে একাধিক সমান্তরাল বিদ্যায়তনিক অধিবেশন। দারিদ্র্য ও বৈষম্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, শিক্ষা, লিঙ্গ এবং জলবায়ু পরিবর্তন- সহ নানা বিষয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন গবেষক ও শিক্ষাবিদরা। প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময়ে সমকালীন সামাজিক সমস্যার নানা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও উঠে আসে।
দেশ- বিদেশের গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রথম দিনেই বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত বিদ্যায়তনিক পরিবেশ। গবেষণা ও নীতি- নির্ধারণের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি এবং গবেষণাকে সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে কাজে লাগানোর প্রত্যয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় কনক্লেভের প্রথম দিনের কর্মসূচি।

