সাথী দাস, পুরুলিয়া, ১৩ জানুয়ারি: পুরুলিয়ায় মকর সংক্রান্তির পরবের আবেগে ঘা দিল করোনা। কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। পরবকে কেন্দ্র করে খেলা মেলা সব বন্ধ। এবার মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে কোথাও বসছে না মেলা। চলছে তারই প্রচার।

করোনার প্রকোপ পড়েছে পুরুলিয়া জেলাতে। সংক্রমণ বাড়ছে হু হু করে। আক্রান্ত হচ্ছেন বহু মানুষ। শহর থেকে গ্রাম কোথাও নেই বাকি। ঝালদা-১ ব্লকের তুলিন সুবর্ণরেখা নদীর ধারে প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে আয়োজিত মেলায় লক্ষাধিক মানুষের ভিড় হয়। স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে মাইক দিয়ে প্রচার করা হল মেলা বসবে না এবার। মানুষকে সচেতন করতে তুলিন গ্রামে মাইক প্রচার করে তা বলা হল। তবে করোনা বিধি মেনে পুণ্যার্থীরা সুবর্ণরেখা নদীতে স্নান করলে তাতে বাধা নেই। তবু থাকবে প্রশাসনের কড়া নজর।
এছাড়া জয়পুরের কাঁসাই নদীর পাড়ে দেউলঘাটায় সংক্রান্তির দিন হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সেখানেও পুলিশের পক্ষ থেকে মেলা না হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পুরুলিয়া শহরের কাছে একই নদীর চরে মেলা বসে, হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ ঘটে। হয় চৌডল প্রতিযোগিতা। রাশ টানা হয়েছে তাতেও। এর মধ্যেও পরবের প্রস্তুতি দেখা গিয়েছে জেলাজুড়ে।

রাত পোহালেই সকাল থেকে শুরু হয়ে যাবে পুরুলিয়াবাসীর প্রত্যাশিত টুসু বিসর্জনকে ঘিরে
উৎসব ও মেলা। তার আগের দিন চূড়ান্ত প্রস্তুতি দেখা গেল জেলা সদর থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জে। পুরুলিয়া তথা সাবেক মানভূমের বড় উৎসব হল টুসু পরব।বাঙালীর মহোৎসব দুর্গাপুজাকেও ছাপিয়ে যায় এই পরব। এবার করোনার কারণে প্রভাব পড়ছে মকর পরবে। তবে, এই উপলক্ষ্যে শেষ বেলার প্রস্তুতি দেখা গেল পুরোদমে। শহর-গ্রামের বাজার-হাটে নতুন জামা কাপড় কেনার জন্য ঢল নামে। মকর সংক্রান্তিতে স্নান সেরে নতুন বস্ত্র গায়ে দিয়ে উৎসবে মাততেই বেচা-কেনা জমে উঠল হাটে-বাজারে। এছাড়া পুরুলিয়া জেলার গ্রামীণ হাট গুলো রঙিন করে দেয় চৌডল।
পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলার চেয়ে সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য একেবারে আলাদা পুরুলিয়া জেলায়। বৈচিত্রময় এই জেলার প্রধান উৎসব এই কারণেই মকর পরব। আর এই পরবকে কেন্দ্র করেই এক সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হয় প্রস্তুতি। পিঠে-পুলি তৈরির উপাদান সামগ্রী থেকে শুরু করে সংক্রান্তির দিন গায়ে দেওয়ার জন্য নতুন বস্ত্র সবই জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন উৎসব মুখর মানুষ। গ্রাম এবং শহরাঞ্চলের মানুষ জন এই পরবকে আঁকড়ে ধরে রুজি রোজগারের পথও প্রশস্ত করেছে। পরবের চারদিন আগে শেষ দু’দিন তাই জমে উঠেছিল বাজার হাট। জমে গিয়েছে বেচাকেনা। বাদ যায়নি পুরুলিয়া শহরেও। দুর্গাপুজার সময় কাপড়ের ব্যবসাকে ছাপিয়ে গিয়েছে মকর পরবের বাজার।

মকর পরবের বিশেষত্ব হল এই উইসবে টুসুকে চৌডলে বসিয়ে বিসর্জন দেওয়া। রঙিন কাগজ দিয়ে পরবের বেশ আগে থেকে চৌডল বানান শিল্পীরা। হাটগুলিতে তা বিক্রি হয়। আমন ধান গোলায় ওঠার পরই পৌষ মাসজুড়ে মানভূমের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ্মী রূপা টুসু পূজিতা হন। মকর সংক্রান্তির আগের দিন টুসুর জাগরণ করে পরদিনই হয় ভাসান। কাগজের তৈরি এই ঘরে টুসুকে বসিয়ে গান করতে করতে গ্রামের মেয়েরা জলাশয়ের দিকে নিয়ে যান বিসর্জনের উদ্দেশ্যে।
পুরুলিয়াবাসীর এই আবেগে আঘাত দিল করোনা। জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৩২৪। সংক্রমণ ঠেকাতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ তৎপর হয়েছে। আর তারই কারণ এবার আবেগজড়িত মকর সংক্রান্তি ও আখ্যান যাত্রার মেলা বাতিল করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

