আমাদের ভারত, ১১ জুন: গৃহবধূরা সংসার চালান, তাই তাদের হোমমেকার বলে ছোট করবেন না। একটি মামলায় এমনই পর্যবেক্ষণ দেশের শীর্ষ আদালতের। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, গৃহবধূরা শুধু ঘরের কাজ করে না, একটি পরিবারকে ধরে রাখে। পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তুলে দেশ গঠনের কাজে সাহায্য করে।
২০২১ সালের নভেম্বরে পাঞ্জাবে দুর্ঘটনার মৃত্যু হয়েছিল এক গৃহবধূর। তার মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মটর অ্যাক্সিডেন্ট ক্লেইম ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়েছিল পরিবার। সেই নিহতের পরিবারকে ২.৪২ লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় পরিবার। হাইকোর্ট নিহত’র পরিবারকে ৮.৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপরই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় পরিবার। সুপ্রিম কোর্ট সেই ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি করে নির্দেশ দেয় দুই মাসের মধ্যে সংস্থাকে ৬২.৭৮ লক্ষ টাকা দিতে হবে ওই মহিলার পরিবারকে।
সেই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কারোলের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, যারা সংসার সামলান, তারা যে দায়িত্ব পালন করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়তে ও প্রতিপালন করতে তাঁরা সাহায্য করেন। পরিবারের ভিত্তিকে তাঁরা মজবুত করেন। মানুষের অগ্রগতিতে তাঁরা সাহায্য করেন। বিচারপতির কথায়, তাই তাঁদের হোমমেকার না বলে দেশ নির্মাতা বলা উচিত।
বৈবাহিক সম্পর্কে মহিলাদের ভূমিকা কী তা নিয়ে পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করোলের বেঞ্চ জানায়, বিয়ে মানে পরিচারিকা নিয়োগ নয়। তাদের মতে সংসারের দায়িত্ব স্বামী এবং স্ত্রীর উভয়ের। একজন মহিলা বিবাহিত বলে তার পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা খর্ব করা যায় না। সন্তানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার পরেও কোনো মহিলা যদি নিজের পেশায় সফল হতে চান তাহলে তা তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের প্রতি সেটা নির্মমতা বলে ধরে নেওয়া যায় না।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, মহিলারা এমন অনেক আত্মত্যাগ করেন যা তেমনভাবে লক্ষ্যই করা হয় না। যে মহিলার সময় ও ক্ষমতা নিজে সংসারের জন্য ব্যয় করেন, তিনি কিন্তু সেই সংসারের উপার্জনের বিনিয়োগ করেন। তাই তাদের কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দেওয়া উচিত। বেঞ্চের আরো পর্যবেক্ষণ, দীর্ঘদিন ধরে কোনো টাকা না নিয়ে শ্রম দেন, সেবা করেন মহিলারা। তার পরিপ্রেক্ষিতে পারিবারিক সম্পত্তিতেও তাদের অধিকার রয়েছে। বিচারপতি করোলের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, যারা সংসার করেন তারা ঘরের যে কাজ করেন, সেবা প্রদান করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অস্বীকার করা যায় না।
তারপরে মোটর দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার বিষয় গাইডলাইন প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষত দুর্ঘটনায় বধূর মৃত্যু হলে পরিবারকে কতটা আর্থিক সাহায্য করা হবে তার স্থানীয় বিধি প্রকাশ করা হয়েছে। বিচারপতি করোলের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, একটি দেশ এবং মানব সমাজের অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে গৃহবধূর। হোমমেকাররা দেশ গঠন করে। দেশের নির্মাণকারী হিসেবে একজন বধূর ভূমিকা বিবেচনা করে আমরা দেখেছি পরিবারের লোকজনকে সেবা দান, সংসারের কাজকর্মে ন্যূনতম মাসিক মূল্য ৩০ হাজার টাকা। সুপ্রিম কোর্ট আরো জানায়, সারাদেশে লক্ষ লক্ষ বধূ সংসারের জন্য যে কাজ করেন তা সেভাবে লক্ষ্যই করা হয় না। তার মূল্য দেওয়া হয় না। তাই তাকে শুধু হোমমেকার বলা উচিত নয়, দেশ নির্মাতা বলা দরকার।

