আমাদের ভারত, কলকাতা, ১৯ অক্টোবর: দুর্গাপুজোর প্রেক্ষাপটে তৈরি একটি বিশেষ ফটো সিরিজের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত দ্বিচারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললেন কলকাতার পরিচিত ডিজিটাল ক্রিয়েটর হেমশ্রী ভদ্র।
তাঁর প্রশ্ন, যে সমাজ নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে দেবী দুর্গার আরাধনা করে, সেই সমাজই যদি বাস্তব জীবনে নারীদের অবজ্ঞা করে, তবে সেই আরাধনার প্রকৃত তাৎপর্য কোথায়?
মা দুর্গার সুসজ্জিত প্রতিমার সামনে তোলা এই ফটো সিরিজে হেমশ্রীকে দেখা গিয়েছে ঐতিহ্যবাহী সাদা শাড়ি ও লাল ব্লাউজে। একটি ছবিতে তিনি দু’হাতে এক ব্যক্তির দিকে মাটি এগিয়ে দিচ্ছেন, আর সেই ব্যক্তি মাথা নিচু করে তা গ্রহণ করছেন। অন্য একটি ছবিতে এক রূপটানশিল্পী তাঁর চোখে কাজল পরিয়ে দিচ্ছেন। আরও একটি ছবিতে ক্যামেরা, আলো এবং শুটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের উপস্থিতি ফুটে উঠেছে। সেখানে হাতে ধরা একটি আয়না আড়াল করে রেখেছে হেমশ্রীর মুখ।

এই ফটো সিরিজের মূল বিষয় বাংলার দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ‘পুণ্য মাটি’। বাংলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, প্রতিমা নির্মাণের মাটির সঙ্গে যৌনকর্মীর বাড়ির দোরগোড়া থেকে সংগৃহীত মাটিও মেশানো হয়। এই প্রথার প্রতীকী তাৎপর্যকে সামনে রেখেই সমাজের এক গভীর বৈপরীত্য তুলে ধরতে চেয়েছেন হেমশ্রী। যে মাটি ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠানে পবিত্র বলে গ্রহণ করা হয়, সেই মাটির সঙ্গে যুক্ত নারীদেরই অনেক সময় সামাজিক কলঙ্ক, নৈতিক বিচার ও অবজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়।
এই প্রসঙ্গে হেমশ্রী ভদ্র বলেন, “পবিত্র মাটি গ্রহণ করার জন্য মানুষ মাথা নত করে, অথচ যে নারী সেই মাটি দেন, তাঁকেই সমাজ বহু সময় নিচু চোখে দেখে। তাঁর দেওয়া মাটি যদি দেবীর জন্য পবিত্র হতে পারে, তাহলে তাঁর মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন? পুজো আমাদের সম্মান করতে শেখাক, বেছে বেছে কাউকে সম্মান করতে নয়।”
এই ফটো সিরিজে নারীর সামাজিক অবস্থানের পাশাপাশি তাঁর প্রকাশ্য পরিচয় এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। রূপটানের তুলি, আয়না এবং চারপাশের ক্যামেরা এখানে বিশেষ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই উপাদানগুলির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে সমাজ একজন নারীকে দেখে, কীভাবে তাঁর পরিচয় অন্যের সামনে তুলে ধরে এবং কীসের ভিত্তিতে তাঁকে বিচার করে।
বহু ক্ষেত্রেই একজন নারীর ব্যক্তিত্ব, মানবিকতা কিংবা মর্যাদার পরিবর্তে তাঁর পোশাক, চেহারা, সৌন্দর্য অথবা পেশাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিচার শুরু হয়। হেমশ্রীর এই শিল্পভাবনা কোনওভাবেই মা দুর্গার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বা ভক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি নয়। বরং দেবীর আরাধনার সঙ্গে যুক্ত শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও সম্মানের মূল্যবোধকে পুজোমণ্ডপের বাইরেও বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানায় এই ফটো সিরিজ।
এই ছবিগুলি দর্শকদের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে যে সমাজ দেবীকে মাতৃশক্তি হিসেবে পুজো করে, সেই সমাজে প্রত্যেক নারীর সম্মান, স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদা কি সমান গুরুত্ব পায়? এই ফটো সিরিজের মূল বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাস্তব জীবনে নারীর প্রতি অবজ্ঞা কখনও একসঙ্গে চলতে পারে না।

