পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৪ জুলাই: ‘মা’, এই একটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, স্নেহ, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ মমতার এক অনন্য প্রকাশ। সেই মাতৃত্বের আবেগকেই পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তার সঙ্গে যুক্ত করে পশ্চিম মেদিনীপুরে শুরু হলো জেলাস্তরীয় অরণ্য সপ্তাহ পালন। মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রতীক হিসেবে চারা গাছ রোপণের মধ্যে দিয়ে এ বছরের অরণ্য সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে বন সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সকলকে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেই গাছকে বড় করে তোলার অঙ্গীকার করার আহ্বান জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা, পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা, মেদিনীপুর, খড়্গপুর ও রূপনারায়ণ বন বিভাগের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার (ডিএফও)-রা, বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক এবং বনদপ্তরের আধিকারিকরা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র- ছাত্রী, পরিবেশপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ।
প্রতীকি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে অরণ্য সপ্তাহের সূচনা হওয়ার পর বনদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় প্রায় পাঁচ লক্ষ চারা গাছ বিতরণ ও রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে বিগত বছরের তুলনায় এ বছর বৃক্ষরোপণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বনদপ্তর সূত্রের দাবি, সরকারি অনুদান না আসার কারণেই রোপণের পরিধি কমাতে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা একবাক্যে বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেই গাছকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও সকলের। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই।
ছাত্র- ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, “মা যেমন আমাদের স্নেহে, ভালোবাসায় ও যত্নে আগলে রাখেন, তেমনই গাছ আমাদের প্রকৃতিকে রক্ষা করে এবং জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেন, ছায়া ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই মায়ের প্রতি যেমন আমাদের টান ও দায়িত্ববোধ থাকে, তেমনই প্রতিটি গাছের প্রতিও সেই ভালোবাসা ও দায়িত্ব তৈরি করতে হবে। শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না, তাকে বড় করে তোলার অঙ্গীকারও করতে হবে।”
জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করি। কিন্তু অনেক সময় অসচেতনভাবে প্লাস্টিক, পলিব্যাগ, খাবারের প্যাকেট বা অন্যান্য বর্জ্য ফেলে বনাঞ্চলের ক্ষতি করি। এই অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। বন ও পরিবেশ রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। জঙ্গল ধ্বংস হলে তার প্রভাব শুধু বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কৃষি, জলসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপরও তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বনদপ্তরের আধিকারিকরা জানান, বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি চারাগুলির নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হবে। স্কুল- কলেজের ছাত্র- ছাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, শালবনী এলাকায় বনদপ্তরের জমি দখল নিয়ে কড়া অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক বিমান মাহাত। তিনি বলেন, বনদপ্তরের জমি যারা অবৈধভাবে দখল করেছেন বা ভবিষ্যতে দখলের চেষ্টা করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
অরণ্য সপ্তাহের সূচনালগ্নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে— একটি গাছ শুধু একটি চারা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি। তাই প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি তার পরিচর্যার দায়িত্বও গ্রহণ করতে হবে। সেই বার্তাকে সামনে রেখে পশ্চিম মেদিনীপুরে শুরু হলো এবারের অরণ্য সপ্তাহ।

