“মদ্যপ স্বামীদের অত্যাচারে অতিষ্ট, গ্রামে মদ বিক্রি বন্ধ করুন”, কাঁকসার কোটালপুকুরের মহিলাদের করুন আর্তি 

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ১৮ এপ্রিল: ‘আগে মদ বিক্রি বন্ধ করুন, তারপর স্বনির্ভরতার আশা দেখান।’ মদ্যপ স্বামীদের অত্যাচারে অতিষ্ট স্ত্রীরা। সংসার অনটনে জর্জরিত। তবুও অত্যাচারের রোজগারে বিমুখ। আর তাই অত্যাচারের হাত থেকে সংসার বাঁচাতে এমনই করুন আর্তি কাঁকসা থানার বনকাটি পঞ্চায়েতের কোটালপুকুর গ্রামের মহিলাদের। 

কাঁকসার জঙ্গলমহলে অজয় নদী তিরবর্তী কোটালপুকুর গ্রাম। ৬০ টি পরিবারের বসবাস। বেশিরভাগই পেশায় দিনমজুর। মাঠে চাষের কাজ না জুটলে অজয় নদীর বালিঘাটে কাজ করে গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষ। অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী। তার মধ্যেই কোনো ভাবে দিনমজুর খেটে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। সংসারের হাল টানতে গ্রামের মহিলারা স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরীর করেছে। কোরোনার মাহামারি কাটিয়ে আর্থিক অনটনে জর্জরিত। তাই গোষ্ঠীর উদ্যোগে নানান কাজ করে স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এগিয়ে চলতে আদম্য ইচ্ছা মহিলাদের। এমনকি গ্রামে সুষ্ঠ শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে আগ্রহী। অভিযোগ, গ্রামের একটি পরিবার বেআইনী মদ বিক্রি করে চলেছে বিগত কয়েকবছর ধরে। যার পরিণামে গ্রামের পুরুষরা ওই মদ্যাপানে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সারাদিনে যা রোজগার করে, বিকাল হলেই মদ্যপান করে বাড়ি ফেরে। মদ্যপ অবস্থায় বাড়িতে অশান্তি সৃষ্টি করে। পরিবারের লোকজনদের মারধর থেকে নানানভাবে অত্যাচার করে। আর এই মদ্যপ স্বামীদের অত্যাচারে অতিষ্ট সংসারের স্ত্রী ও সন্তানরা। ইতিমধ্যে ৪-৫ টি পরিবার সর্বাসান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের সংসার একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। সংসারের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা লাটে উঠেছে। গোটা গ্রামজুড়ে অশান্তির আবহ বয়ছে। গ্রামের সুষ্ঠ সামাজিক পরিবেশ নষ্ঠ হচ্ছে। এমনকি সংসারের মহিলারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় অসহায় হয়ে পড়েছে। তাই সুবিচারের আশায় পুলিশ প্রশাসনের শরণাপন্ন। বর্তমান সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে গ্রামে সুষ্ঠ সামাজিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবী তুলেছে মহিলারা। মালা বাউরী নামে এক নিপিড়িত মহিলা জানান,” বালিঘাটে দু’শ টাকা রোজগার করলে ১০০ টাকার মদ খেয়ে আসে। দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেয়ে যায়। এক’শ দিনের কাজও সেভাবে হয় না। যেটুকু হয়, তার মজুরী তুলে মদ খেয়ে নেয়। কিছু বললেই, খাবার দিলে ছুড়ে ফেলে দেয়। নির্মম অত্যাচার করে। মদ্যপ স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ট।” 

শিবাণী বাউরি নামে আর এক মহিলা জানান, “মাতাল বাবার আচরণে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা লাটে উঠেছে। রাত হলেই অত্যাচার শুরু। মারধর করে বাড়ির বাইরে বের করে দেয়।” গ্রামে ৮ মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী রয়েছে। উষরমুক্তি প্রকল্পে ধান, সরষে চাষ শুরু করেছিল। কিন্তু মদ্যপ স্বামীদের অত্যাচারে সংসারের অশান্তিতে বিমুখ হয়ে পড়েছে মহিলারা। সাধনা সিংহ নামে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্ঘনেত্রী জানান, “ইতিমধ্যে ৩ গোষ্ঠী কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। মদের গ্রাসে বেশকয়েকটি পরিবার সর্বসান্ত হয়ে পড়েছে। অর্থাভাবে কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। সংসারে অশান্তির কারনে মহিলাদের কাজে মন নেই।” গ্রামের মহিলাদের দাবি, “দিন কয়েক আগে গ্রামে পুলিশ এসেছিল। হাতজোড় করে গ্রামে মদ বিক্রি বন্ধের করুন আবেদন করেছি। কিন্তু, কোন সুরাহা হয়নি। গোষ্ঠীর মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মদ্যপ স্বামীদের অত্যাচার সেই স্বপ্ন ক্ষিন
হয়ে গেছে। তাই প্রশাসনের নিকট আবেদন গ্রামের বেআইনি মদ বিক্রি বন্ধের করুক। মহিলাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকায় পুলিশ টহলের ব্যাবস্থা করুক।” ক্ষুব্ধ মহিলারা আরও হুঁশিয়ারী দিয়ে জানান, “সম্মিলিতভাবে আবারও পুলিশকে জানাবো। তারপরও গ্রামে বেআইনী মদ বিক্রি বন্ধ না হলে আন্দোলন শুরু হবে।” 

প্রশ্ন, লকডাউনের সঙ্কটকালে গ্রামবাসীদের রোজগারে কেন বন্ধ এক’শ দিনের কাজ? অনুমতি ছাড়া কিভাবে চলছে গ্রামে বেআইনী মদ বিক্রি? যার কবলে আস্ত গ্রামটা সর্বসান্ত হচ্ছে। বনকাটি পঞ্চায়েত প্রধান পিন্টু বাগদী জানান, “বহুবার ওই পরিবারটিকে গ্রামে মদ বিক্রি বন্ধের জন্য বলেছি। কিন্তু শোনেনি। বিষয়টি পুলিশ ও ব্লক প্রশাসনকে জানাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “গ্রামে আর্থসামজিক উন্নয়নে চলতি অর্থবছরে পুনরয় একশো দিনের কাজ শুরু হবে।” 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *